মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (IRGC) নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরিকে হত্যার দাবি করেছে ইসরাইল। হরমুজ প্রণালী অবরোধের অন্যতম কারিগর এবং ইরানের সমুদ্রসীমার প্রধান প্রতিরক্ষা প্রধানকে হত্যার এই দাবি ঘিরে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। ইসরাইলি প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বরাতে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'টাইমস অফ ইসরাইল' (Times of Israel) এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
বন্দর আব্বাসে নিখুঁত অপারেশন: কী ঘটেছিল সেখানে?
ইসরাইলি প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, ইরানের অন্যতম প্রধান সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র বন্দর আব্বাসে (Bandar Abbas) একটি অতর্কিত বিমান হামলা (Airstrike) চালানো হয়। এই হামলায় আলিরেজা তাংসিরিকে সরাসরি টার্গেট করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, বন্দর আব্বাস ইরানের নৌবাহিনীর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘাঁটি এবং সেখান থেকেই পুরো পারস্য উপসাগরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে এই চাঞ্চল্যকর দাবি প্রসঙ্গে এখন পর্যন্ত ইরান সরকার কিংবা আইআরজিসির (IRGC) পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কে এই আলিরেজা তাংসিরি? কেন তিনি ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য?
আলিরেজা তাংসিরি শুধুমাত্র একজন নৌ-কমান্ডারই ছিলেন না, বরং তাকে ধরা হতো হরমুজ প্রণালীর ‘প্রহরী’। পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথটি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এই জলপথের প্রভাব অপরিসীম। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে, তখন তাংসিরির নেতৃত্বেই আইআরজিসি এই জলপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। তার নির্দেশেই আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজের গতিপথ ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় ছিল পশ্চিমী বিশ্ব। তাকে সরিয়ে দেওয়া ইসরাইলের জন্য এক বড় ধরনের কৌশলগত বিজয় (Strategic Victory) হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত ও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকেই ইরান এবং ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র বলয়ের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অঞ্চলে 'শ্যাডো ওয়ার' (Shadow War) বা ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিতে শুরু করেছে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডারের মৃত্যু যদি নিশ্চিত হয়, তবে তেহরানের পক্ষ থেকে এর ভয়াবহ প্রতিশোধ নেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় (Regional Security) নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন (Global Supply Chain) তথা তেলের বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অপেক্ষারত বিশ্ব: তেহরানের প্রতিক্রিয়া কী হবে?
ইসরাইলের এই দাবি যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি হবে কাসেম সোলেইমানি হত্যার পর ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় সামরিক আঘাত। আপাতত তেহরানের নীরবতা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইআরজিসি তাদের কমান্ডারের অবস্থান এবং বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তবেই মুখ খুলবে। পুরো অঞ্চল এখন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে একটি ভুল পদক্ষেপ বড় ধরনের যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।