ইসরাইলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেল আবিবের আকাশ হঠাৎ করেই যেন এক অন্ধকার চাদরে ঢাকা পড়ে গেল। তবে এটি কোনো মেঘ নয়, বরং হাজার হাজার কাকের এক বিশাল ঝাঁক। গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) শহরের সুউচ্চ আজরিয়েলি টাওয়ারসহ (Azrieli Towers) বিভিন্ন গগনচুম্বী ভবনের চারপাশে পাখিদের এই অস্বাভাবিক ওড়াউড়ির দৃশ্য ধরা পড়েছে ক্যামেরায়। মুহূর্তেই সেই ‘ভাইরাল ভিডিও’ (Viral Video) ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে, যা জন্ম দিয়েছে নানা রহস্য আর জল্পনা-কল্পনার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আতঙ্ক: ‘সর্বনাশের আগাম বার্তা’?
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitics) পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে অনেকে কেবল প্রাকৃতিক দৃশ্য হিসেবে মেনে নিতে পারছেন না। বিশেষ করে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝে নেটিজেনদের বড় একটি অংশ একে ‘হারবিঞ্জার অব ডুম’ (Harbinger of Doom) বা মহাবিপর্যয়ের সংকেত হিসেবে অভিহিত করছেন। অনেকেই দাবি করছেন, প্রকৃতির এই আচরণ আসলে কোনো বড় ধরনের যুদ্ধের বা আসন্ন ধ্বংসযজ্ঞের অশুভ লক্ষণ।
বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী ও ‘আর্মাগেডন’ আতঙ্ক
রহস্যপ্রিয় নেটিজেনদের অনেকেই এই ঘটনার সঙ্গে ধর্মীয় শাস্ত্রের যোগসূত্র খুঁজছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বাইবেলের ‘বুক অব রেভেলেশন’-এর (Book of Revelation) ১৯তম অধ্যায়ের উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। সেখানে বর্ণিত ‘আর্মাগেডন’ বা চূড়ান্ত যুদ্ধের একটি দৃশ্যের সঙ্গে এই পরিস্থিতির তুলনা করা হচ্ছে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এক স্বর্গদূত আকাশচারী পাখিদের ‘ঈশ্বরের মহাভোজে’ অংশ নিতে আহ্বান জানাবেন। তেল আবিবের আকাশে কাকের এই ঘনঘটা যেন অনেকের কাছে সেই প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা: এটি কি কেবলই পরিযায়ী পাখিদের বিচরণ?
তবে অলৌকিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ছাপিয়ে বিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং বিজ্ঞানসম্মত বলে দাবি করছেন। পক্ষীবিদ ও গবেষকদের মতে, ইসরাইল ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম ‘বার্ড মাইগ্রেশন রুট’ (Bird Migration Route) বা পাখি চলাচলের পথের ওপর অবস্থিত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘ডেইলি মেইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর বসন্তকালে প্রায় ৫০ কোটি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ইউরোপ ও এশিয়া থেকে আফ্রিকার দিকে যাওয়ার পথে ইসরাইলের ওপর দিয়ে যাতায়াত করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘হুডেড ক্রো’ বা নির্দিষ্ট প্রজাতির এই কাকগুলো প্রায়শই শহুরে এলাকায় দলবদ্ধভাবে বিচরণ করে। বিশেষ করে বড় বড় দালানের ওপর দিয়ে এদের ওড়াউড়ি করাটা এক ধরণের সামাজিক আচরণ বা খাবারের সন্ধানে চলাফেরার অংশ হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো ‘অ্যাপোক্যালিপ্টিক’ (Apocalyptic) সংকেত নয়, বরং প্রকৃতির এক চমৎকার কিন্তু স্বাভাবিক রূপ।
গুজব বনাম বাস্তবতা: এক অস্থির সময়ের প্রতিফলন
বর্তমানে ইসরাইল ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, তার প্রভাবেই মূলত সাধারণ মানুষের মাঝে এই ধরণের ভীতি ছড়িয়েছে। যখন কোনো অঞ্চলে চরম অনিশ্চয়তা কাজ করে, তখন সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনাকেও মানুষ ‘সুপারন্যাচারাল’ (Supernatural) বা অতিপ্রাকৃত হিসেবে দেখতে শুরু করে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের ফলে এই ধরণের চাঞ্চল্যকর তথ্য ও ভিডিও মুহূর্তেই ‘গ্লোবাল ট্রেন্ড’ (Global Trend) হয়ে উঠছে।
তেল আবিবের আকাশে কালো কাকের সেই ওড়াউড়ি শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক নিয়ম হিসেবেই প্রমাণিত হোক কিংবা মানুষের মনের আতঙ্ক হয়েই থাকুক—এটি বর্তমান বিশ্বের অস্থির মানসিকতা ও ডিজিটাল প্রচারণার এক অনন্য নজির হয়ে রইল।