• আন্তর্জাতিক
  • হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ‘টোল বুথ’: জাহাজপ্রতি ফি ২০ লাখ ডলার! বিশ্বজুড়ে চরম জ্বালানি সংকটের শঙ্কা

হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ‘টোল বুথ’: জাহাজপ্রতি ফি ২০ লাখ ডলার! বিশ্বজুড়ে চরম জ্বালানি সংকটের শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ‘টোল বুথ’: জাহাজপ্রতি ফি ২০ লাখ ডলার! বিশ্বজুড়ে চরম জ্বালানি সংকটের শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আগ্রাসনের জবাবে রণকৌশল বদলাল তেহরান; অবরুদ্ধ জলপথে আটকে আছে ২ হাজার জাহাজ, ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল।

বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন অস্থিরতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় এবার এই কৌশলগত জলপথকে আয়ের উৎস ও ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পথে হাঁটছে ইরান। লোহিত সাগরের পর এবার পারস্য উপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে তেহরান। প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রণালী পার হতে প্রতিটি জাহাজকে ২০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ফি দিতে হচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।

আইন পাসের তোড়জোড় ও আইআরজিসি’র নিয়ন্ত্রণ

ইদানীংকালে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকায় ইরান সরকার হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে শুল্ক আদায়ের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করেছে। ইরানের গণমাধ্যম তাসনিম ও ফার্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটি ইতিমধ্যে একটি খসড়া বিল প্রস্তুত করেছে। তবে প্রশাসনিক এই প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) গত দুই সপ্তাহ ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে টোল আদায় শুরু করেছে বলে মেরিটাইম নজরদারি সংস্থা লয়েডস লিস্ট (Lloyd's List) নিশ্চিত করেছে।

ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এই পদক্ষেপকে যৌক্তিক দাবি করে বলেন, “হরমুজ প্রণালী একটি আন্তর্জাতিক করিডর হলেও এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ইরান। সুতরাং এই জলপথ ব্যবহারকারী ট্যাঙ্কারগুলো থেকে সিকিউরিটি ফি বা শুল্ক আদায় করা একটি স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া।”

জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস

হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে বর্তমানে প্রণালীর দুই পাশে প্রায় ২ হাজার পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এই অবরোধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এশিয়ার দেশগুলোতে ‘এনার্জি রেশনিং’ এবং শিল্পোৎপাদন হ্রাসের মতো বিপর্যয় দেখা দেবে। এটি পর্যায়ক্রমে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বা Global Recession-এর দিকে ঠেলে দিতে পারে বিশ্বকে।

যেভাবে চলছে টোল আদায় ও ছাড়পত্র প্রদান

আইআরজিসি-অনুমোদিত একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমানে সীমিত আকারে জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে। এর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল: ১. মধ্যস্থতাকারী যোগাযোগ: জাহাজ মালিকদের প্রথমে আইআরজিসি-র নির্দিষ্ট এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। ২. তথ্য যাচাই: জাহাজের আইএমও নম্বর (IMO Number), পণ্যের ধরন, ক্রুদের তালিকা এবং গন্তব্য সংক্রান্ত সব ডকুমেন্ট জমা দিতে হয়। ৩. কোড ও নিরাপত্তা: তথ্য যাচাই শেষে নৌবাহিনী একটি সিকিউরিটি কোড ও নির্দিষ্ট রুট বরাদ্দ করে। ৪. রেডিও ভেরিফিকেশন: প্রণালীতে প্রবেশের সময় রেডিওর মাধ্যমে কোডটি মিলিয়ে নেওয়া হয় এবং ইরানি নৌবাহিনী স্কর্ট দিয়ে জাহাজটিকে পার করে দেয়।

ইরানি সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি জানিয়েছেন, যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার মেটাতেই এই টোল আরোপ করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে জাহাজপ্রতি ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে এবং চীন, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে (Yuan) এই ফি পরিশোধ শুরু করেছে। তবে ভারত সরকারের দাবি, তারা এখন পর্যন্ত কোনো ফি প্রদান করেনি।

আন্তর্জাতিক আইন ও অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ

জাতিসংঘের সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অধিকার সংরক্ষিত এবং তা স্থগিত করার কোনো আইনি বৈধতা নেই। তবে ইরান এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের দাবি, তারা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি, ফলে তারা নিজেদের জলসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির প্রধান সুলতান আল-জাবের একে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ (Economic Terrorism) হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, “ইরান যখন হরমুজ প্রণালীকে জিম্মি করে, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব প্রতিটি সাধারণ মানুষের খাদ্য ও ওষুধের দামের ওপর পড়ে।”

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের এই একাধিপত্য এবং টোল আদায়ের ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। কূটনৈতিক উপায়ে এই সমস্যার সমাধান না হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা (Energy Security) চরম হুমকির মুখে পড়বে।

Tags: energy crisis supply chain geopolitics global economy maritime news iran news oil price strait of hormuz irgc update toll fees