মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যুক্ত হলো নতুন এক সমীকরণ। দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে এবার সরাসরি শামিল হলো ইয়েমেনের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি (Houthi)। শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে দক্ষিণ ইসরায়েল লক্ষ্য করে একটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) নিক্ষেপের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই লড়াইয়ে নিজেদের উপস্থিতির জানান দিল গোষ্ঠীটি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরায়েল’-এর প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিয়ারশেবায় আতঙ্ক: আকাশেই ধ্বংস হলো ক্ষেপণাস্ত্র
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) জানিয়েছে, ইয়েমেন থেকে ছুড়ে মারা ক্ষেপণাস্ত্রটি শনাক্ত করার পরপরই তাদের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) সক্রিয় হয়ে ওঠে। আইডিএফ-এর দাবি, জনবহুল এলাকায় আঘাত হানার আগেই ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশেই সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে এই হামলার পরপরই দক্ষিণ ইসরায়েলের বিয়ারশেবা ও এর আশপাশের শহরগুলোতে উচ্চশব্দে বিপৎসংকেত বা সাইরেন বেজে ওঠে। আকস্মিক এই হামলায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে বা ‘বোম্ব শেল্টারে’ অবস্থান নেন। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ইরান যুদ্ধে ইয়েমেনের প্রথম সরাসরি আঘাত
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর ইয়েমেন থেকে এটিই প্রথম সরাসরি হামলা। ইসরায়েলি সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ইয়েমেনের মাটি থেকে উৎক্ষেপণ করা এই ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি ইসরায়েলি ভূখণ্ডকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) ইরান-সমর্থিত হুথিরা নিজেদের ‘প্রক্সি’ অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি ফ্রন্টলাইনে চলে এল বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
পটভূমি: সংহতি থেকে সম্মুখ সমর
হুথিদের এই রণকৌশল নতুন কিছু নয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাস পর থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে লোহিত সাগরে ইসরায়েলগামী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছিল তারা। সে সময় ইসরায়েলি ভূখণ্ডেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল হুথি যোদ্ধারা, যার জবাবে ইসরায়েল ইয়েমেনের হোদেইদাহ বন্দরে নজিরবিহীন বিমান হামলা (Air Strike) চালায়।
২০২৫ সালের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে হুথিরা সাময়িকভাবে তাদের হামলা বন্ধ রেখেছিল। তবে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের নতুন ধাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা পুনরায় সক্রিয় হওয়ার হুমকি দিয়ে আসছিল। আজকের এই হামলা মূলত সেই হুমকিরই বাস্তব প্রতিফলন।
আঞ্চলিক অস্থিরতা ও পরবর্তী শঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের এই সরাসরি অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। একদিকে হিজবুল্লাহ এবং অন্যদিকে হুথিদের সক্রিয়তা ইসরায়েলের জন্য ‘মাল্টি-ফ্রন্ট ওয়ার’ বা বহুমুখী যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধে হুথিদের এই ‘এন্ট্রি’র ফলে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নৌপথ আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যের সাপ্লাই চেইনকে (Supply Chain) নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে।
বর্তমানে বিয়ারশেবাসহ দক্ষিণ ইসরায়েলে কড়া সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং যেকোনো পাল্টা হামলা মোকাবিলায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।