রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে ২৬ জন প্রাণ হারানোর ঘটনায় শোকের ছায়া কাটেনি এখনো। নারী, পুরুষ ও শিশুসহ এতগুলো মানুষের অকাল মৃত্যুতে যখন দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে, তখন এই দুর্ঘটনার নেপথ্যে ফেরিঘাটের চরম অব্যবস্থাপনা ও ত্রুটিপূর্ণ পরিকাঠামোকে দায়ী করছেন প্রত্যক্ষদর্শী বাস চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, পন্টুনে ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে এই ভয়াবহ ‘Accident’ এড়ানো সম্ভব হতো।
রেলিংহীন পন্টুন: মরণফাঁদে পরিণত ৩ নম্বর ঘাট দুর্ঘটনা কবলিত সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি উদ্ধারের পর প্রাথমিক তদন্ত চললেও চালকদের মুখে উঠে আসছে ভিন্ন এক বয়ান। গোল্ডেন লাইন পরিবহনের চালক সাহেব আলী এবং দীর্ঘ ৪০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চালক শৈলনের মতে, ফেরিঘাটের পন্টুনে কোনো রেলিং বা মজবুত ‘Barricade’ ছিল না। শৈলন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পন্টুনে যদি লোহার রেলিং থাকত, তবে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারালেও নদীতে পড়ার আগে সেখানে আটকে যেত। সরকারের উচিত ছিল সাধারণ মানুষের ‘Public Safety’ নিশ্চিত করা, কিন্তু সেই নজরদারি এখানে নেই।”
বিপজ্জনক অ্যাপ্রোচ সড়ক ও যান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ দৌলতদিয়া ঘাটের ‘Approach Road’ বা সংযোগ সড়কগুলো অত্যন্ত ঢালু ও খাড়া, যা বর্ষা বা কুয়াশার সময় আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। চালকদের দাবি, পন্টুনের উপরিভাগ বা ‘Floor’ পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় অনেক সময় ব্রেক ধরলেও চাকা স্লিপ কাটে। চালক রিয়াজুল ইসলামের মতে, পন্টুনের ওপরের যে গ্রিপ বা বিট থাকার কথা, তা দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে মসৃণ হয়ে গেছে। এর ফলে যেকোনো ছোট যান্ত্রিক ত্রুটি—যেমন ‘Steering Lock’ বা টায়ার রডের হুক ছুটে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে চালকের আর কিছুই করার থাকে না।
সমন্বয়হীনতা ও বিআইডব্লিউটিসি-র ব্যবস্থাপনা ত্রুটি পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগের আঙুল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থা (BIWTC)-এর ব্যবস্থাপনার দিকেও। সৌহার্দ্য পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মনির হোসেনের দাবি, ঘাটের জিরো পয়েন্টে অনেক সময় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বদলে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করেন। তারা অনেক সময় ঘাটের ভেতরের পরিস্থিতি বা ফেরি ভেড়ার সময় না বুঝেই তাড়াহুড়ো করে গাড়িগুলোকে পন্টুনে পাঠিয়ে দেন। দুর্ঘটনার দিনও একটি ছোট ফেরি পন্টুনে সজোরে ধাক্কা দেওয়ার ফলে সৃষ্ট কম্পনে বাসের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং ঢালু পন্টুন দিয়ে বাসটি সরাসরি নদীতে তলিয়ে যায়।
তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ও বর্তমান পরিস্থিতি ইতিমধ্যে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সরকারের পক্ষ থেকে দুটি পৃথক ‘Investigation Committee’ বা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন জানিয়েছেন, ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের সহায়তায় বাসটি উদ্ধার করা হয়েছে এবং তদন্ত কমিটি বর্তমানে সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করছে। তবে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পদ্মা সেতু (Padma Bridge) চালু হওয়ার পর দৌলতদিয়া রুটে যানবাহনের চাপ কমলেও এই ঘাটের গুরুত্ব এখনো অপরিসীম। বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে এটি অন্যতম প্রধান রুট। চালকদের দাবি, অভিশপ্ত এই ৩ নম্বর ঘাটসহ সব ফেরিঘাটে অতি দ্রুত ‘Infrastructure Development’ এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যারিকেড সিস্টেম চালু করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন স্বজন হারানোর বেদনায় নীল হতে না হয়।