পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা সীমান্তের মনোরম তালসারি সমুদ্রসৈকতে তখন চলছিল নতুন এক সিরিয়ালের শুটিং। অথচ সেই মনোরম পরিবেশই যে টলিউড অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা কল্পনাও করতে পারেনি তাঁর প্রোডাকশন ইউনিট (Production Unit)। রাহুলের এই আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে যখন চারদিকে নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই সেই অন্তিম মুহূর্তের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল।
সমুদ্রের গভীরে সেই মরণখেলা গত রোববার (২৯ মার্চ) তালসারিতে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিকোয়েন্স (Sequence) ধারণ করা হচ্ছিল। পরিচালক শুভাশিসের বয়ান অনুযায়ী, দৃশ্যের প্রয়োজনে রাহুল ও সহ-অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্রকে সমুদ্রের পানিতে নামতে হয়। তাঁরা একে অপরের দিকে পানি ছোড়াছুড়ি করছিলেন এবং লুকোচুরি খেলছিলেন। ক্যামেরার ফ্রেম (Frame) সেট করা হয়েছিল তাঁদের পেছন দিক থেকে।
শুটিং চলাকালীন রাহুল শ্বেতার হাত ধরে ধীরে ধীরে সমুদ্রের গভীরের দিকে এগোতে থাকেন। পরিচালক জানান, প্রথমে পানি গোড়ালি পর্যন্ত ছিল, তারপর হাঁটু। কিন্তু হঠাৎ করেই গভীরতা বেড়ে যাওয়ায় শ্বেতা ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ে যান। শ্বেতাকে বাঁচাতে গিয়ে এবং তাঁর হাত শক্ত করে ধরে রাখায় রাহুলও গভীর পানিতে তলিয়ে যান। ইউনিটের সদস্যরা তৎক্ষণাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে শ্বেতাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ মুহূর্তের মধ্যে রাহুলকে চোখের আড়াল করে দেয়।
উদ্ধারকাজ ও হাসপাতালের সেই করুণ লড়াই রাহুল নিখোঁজ হওয়ার পর প্রোডাকশন ইউনিটের ভেতরে হাহাকার পড়ে যায়। স্থানীয় জেলেদের সাহায্য নিয়ে এবং দড়ি ফেলে প্রায় দুই ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস তল্লাশি চালানো হয়। অবশেষে টেকনিশিয়ানরাই সমুদ্র থেকে রাহুলকে উদ্ধার করেন। নির্বাহী প্রযোজক (Executive Producer) শান্তনু নন্দী সংবাদমাধ্যমকে জানান, পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র ৫ থেকে ৭ মিনিটের ব্যবধানে।
উদ্ধারের সময় রাহুলের জ্ঞান ছিল বলে দাবি করেছেন পরিচালক শুভাশিস। দ্রুত তাঁকে দিঘা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু মাঝপথেই যেন সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
শুটিং নাকি প্যাক-আপ? দানা বাঁধছে রহস্য রাহুলের মৃত্যুর সময় ঠিক কী ঘটছিল, তা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে বড় ধরনের অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। ইউনিটের একটি অংশ দাবি করছে, শুটিং চলাকালীনই দুর্ঘটনাটি ঘটে। অন্যদিকে, গুঞ্জন উঠেছে যে শুটিং আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং ‘প্যাক-আপ’ (Pack-up) ঘোষণার পর অভিনেতা নিজের ইচ্ছায় সমুদ্রে নেমেছিলেন।
এই রহস্যের জট খুলতে ওড়িশা পুলিশ ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে। শুটিংয়ের ডিভিডি (DVD) এবং র ফুটেজ (Raw Footage) পরীক্ষা করা হতে পারে বলে জানা গেছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পানির নিচে চোরাবালি বা তীব্র স্রোতের কারণে এই বিপর্যয় ঘটে থাকতে পারে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু টালিপাড়ায় শোকের পাশাপাশি এক গভীর বিষাদ তৈরি করেছে। তাঁর মৃত্যু স্রেফ একটি দুর্ঘটনা নাকি কোনো গাফিলতি ছিল, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ওড়িশা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চূড়ান্ত ময়নাতদন্তের রিপোর্ট (Autopsy Report) হাতে পেলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। আপাতত এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের অকাল পতনে স্তব্ধ দুই বাংলার বিনোদন জগত।