টালিউড অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দুই বাংলার বিনোদন জগতে। শুটিং ফ্লোরে কাজ করার সময় তাঁর এমন অপ্রত্যাশিত বিদায় যেন মেনে নিতে পারছেন না সহকর্মী থেকে শুরু করে অগণিত অনুরাগী। টালিপাড়ার বাতাসে যখন শোকের ভার, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে ছেলের উদ্দেশ্যে লেখা অভিনেতার একটি পুরোনো খোলা চিঠি। জীবনের চরম সত্য আর গভীর আবেগে মোড়ানো সেই চিঠিটিই এখন ভক্তদের কাছে রাহুলের 'শেষ বার্তা' হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
পিতৃত্বের উদযাপন ও এক ‘বেহদ্দ’ বাবার কথা
গত ‘ফাদারস ডে’-তে একমাত্র সন্তান সহজকে উদ্দেশ্য করে এই চিঠিটি লিখেছিলেন রাহুল। তিনি লিখেছিলেন, “এই চিঠিটা আজকে ফাদারস ডে বলে লিখতে বসা। যদিও তোমার বাবা নিজে বেহদ্দ বাংলা মিডিয়াম। জীবনেও ফাদারস ডে, মাদারস ডে—এগুলো আলাদা করে জানত না। কিন্তু কুঁজোর যেমন চিৎ হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, আমারও আজকাল এসব উদযাপন করতে ইচ্ছা করে। আসলে কিছুই না, তোমাকে কাছে পাওয়ার অজুহাত।” মৃত্যুর পর এই কথাগুলোই এখন ভক্তদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।
সংগ্রামের দিনলিপি ও ‘প্রিভিলেজ’-এর পাঠ
চিঠিতে রাহুল স্মৃতিচারণ করেছিলেন তাঁর এবং অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের শুরুর দিনগুলোর কথা। যখন প্রিয়াঙ্কার বয়স ছিল মাত্র ১৪ আর রাহুলের ২১, সেই সময় থেকেই তাঁদের বন্ধুত্বের শুরু। অভাব আর সংগ্রামের সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়ে রাহুল লিখেছিলেন, “যদি কখনও তুমি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, তাহলে তুমি জানবে তুমি প্রিভিলেজড। যে প্রিভিলেজ একটি ১৪ বছরের মেয়ে এবং একটি ২১ বছরের ছেলে দিনের পর দিন অপমানিত হতে হতে অর্জন করেছে, ঘটনাচক্রে যারা তোমার বাবা-মা।”
উপার্জন আর ক্ষমতার দম্ভকে তুচ্ছ জ্ঞান করে রাহুল তাঁর ছেলেকে শিখিয়েছিলেন বিনয়। তিনি লিখেছিলেন, “উপার্জন আর ক্ষমতার আতসকাঁচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই।”
মায়ের আত্মত্যাগ ও অকথিত সংগ্রামের গল্প
সহজের মা প্রিয়াঙ্কা সরকারের প্রতি রাহুলের গভীর সম্মান ফুটে উঠেছে এই চিঠির প্রতিটি ছত্রে। গ্ল্যামার জগতের চাকচিক্যের আড়ালে একজন মা হিসেবে প্রিয়াঙ্কার লড়াইকে রাহুল চিত্রিত করেছেন নিপুণভাবে। তিনি লিখেছিলেন, “আমরা সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই, পিঠে কতগুলো ছুরি গাঁথা আছে দেখতে পাই না। মায়েরা তা সযত্নে লুকিয়ে রাখেন। তোমার মা-ও রেখেছে।” ছেলের প্রতি তাঁর অনুরোধ ছিল, যেন সে বড় হয়ে মায়ের সেই ক্ষতের যত্ন নেয়।
উত্তরাধিকার হিসেবে যা রেখে গেলেন রাহুল
পার্থিব ধনসম্পদের চেয়েও বড় এক উত্তরাধিকার সহজের জন্য রেখে গেছেন রাহুল। তিনি তাঁর ছেলেকে দিয়ে গেছেন পাহাড়, জঙ্গল, নদী আর তাঁর প্রিয় বাংলা ভাষা। রাহুল লিখেছিলেন, “আমি তোমাকে আমার ভাগের সব কটা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি। বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতগুলোকেও পৈতৃক সম্পত্তি ভাবতে পারো।”
বিশেষ করে বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর যে অকৃত্রিম টান, তা এই চিঠিতে স্পষ্ট। তিনি লিখেছিলেন, “তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস। আমার ভাষা, বাংলা।” শুধু চলিত ভাষা নয়, বাংলার সমস্ত আঞ্চলিক রূপ বা ‘ডায়ালেক্ট’-এর ঐশ্বর্যকেও তিনি তুলে দিয়েছেন সহজের হাতে।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই চিরবিদায় টালিপাড়ার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তাঁর এই চিঠিটি কেবল একটি ব্যক্তিগত বার্তা হয়ে থাকেনি, এটি হয়ে উঠেছে জীবনের এক গভীর দর্শন, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এক বাবার অমর লিগ্যাসি হিসেবে রয়ে যাবে।