রংপুরে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালক রশিদ মিয়াকে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে রংপুর সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফজলে খোদা মো. নাজির এই জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। রায় প্রদানের সময় দণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামিই কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
দণ্ডপ্রাপ্তদের পরিচয় ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—মিঠাপুকুর উপজেলার রতিয়া পশ্চিমপাড়া গ্রামের শিমুল মিয়া (পিতা: শুক্কুর আলী), রাকিব মিয়া (পিতা: বাবুল মিয়া), রতিয়া মধ্যপাড়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম (পিতা: হেলাল মিয়া) এবং পুটিমারী এলাকার হোসেন মিয়া (পিতা: সুমেল মিয়া)। দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে আদালত সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সামান্য কয়েক টাকা
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী ও পুলিশি তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টার দিকে এক পৈশাচিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে আসামিরা। মিঠাপুকুর উপজেলার কুটিপাড়া গ্রামের শানেরপাড়া ব্রিজ এলাকায় নির্জন স্থানে অটোরিকশা চালক রশিদ মিয়াকে থামিয়ে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায় শিমুল, শফিকুল ও হোসেন। আঘাতের তীব্রতায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রশিদ।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, এই বর্বরোচিত খুনের মূল উদ্দেশ্য ছিল অটোরিকশা ছিনতাই। অথচ হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা কেবল অটোরিকশাটিই নয়, নিহতের পকেটে থাকা নগদ মাত্র এক হাজার ৬৫০ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। একজন মানুষের জীবনের মূল্য অপরাধীদের কাছে সামান্য কিছু টাকার সমান হয়ে দাঁড়ানোয় এলাকায় গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
দ্রুততম সময়ে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন
হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের ছেলে বাদী হয়ে মিঠাপুকুর থানায় একটি হত্যা মামলা (Murder Case) দায়ের করেন। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলায় মোট ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই ঘোষণা করা হলো, যা বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
রংপুর জেলা কোর্ট পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করেছেন।
আইনজীবী ও বাদীপক্ষের প্রতিক্রিয়া
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সরকারি কৌঁসুলি (Public Prosecutor) আফতাব উদ্দিন রায়ের পর গণমাধ্যমকে বলেন, "আমরা আদালতের এই রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট। বাদীপক্ষ ন্যায়বিচার পেয়েছে। এটি সমাজে একটি কঠোর বার্তা দেবে যে, অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।"
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রশিদ চৌধুরী রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জানান, তারা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ এবং আসামিদের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে উচ্চ আদালতে (High Court) আপিল করার প্রস্তুতি নেবেন।
বর্তমানে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কড়া পুলিশি পাহারায় রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।