‘ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’—প্যাকেটের গায়ে লেখা এই সতর্কবার্তা কিংবা বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ প্রচার আজ আমাদের সবারই চেনা। তাসত্ত্বেও তামাকের নেশায় আচ্ছন্ন মানুষের সংখ্যা কমছে না। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ধূমপান কেবল একটি বদভ্যাস নয়, এটি একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক আসক্তি (Addiction)। নিকোটিনের মরণকামড় থেকে বেরিয়ে আসা অনেকের কাছেই পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ মনে হতে পারে। তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা ও জীবনযাপনের কিছু বিশেষ কৌশলে এই অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। এক নজরে দেখে নিন ধূমপান ছাড়ার সেই কার্যকর উপায়গুলো।
নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির (NRT) সহায়তা
দীর্ঘদিনের ধূমপানের অভ্যাস হুট করে ছেড়ে দিলে শরীরে বিভিন্ন ‘Withdrawal Symptoms’ বা প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ দেখা দেয়। এর ফলে প্রচণ্ড মাথাব্যথা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া কিংবা অনিদ্রার মতো সমস্যা হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা এক্ষেত্রে ‘Nicotine Replacement Therapy’ বা NRT-র পরামর্শ দেন। বর্তমানে বাজারে নিকোটিন গাম (Nicotine Gum) বা লজেঞ্জ পাওয়া যায়, যা রক্তে নিকোটিনের মাত্রা বজায় রেখে ধীরে ধীরে আসক্তি কমিয়ে আনে। তবে যেকোনো থেরাপি শুরুর আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
নন-নিকোটিন ওষুধের ভূমিকা
আসক্তি খুব বেশি হলে অনেক সময় কেবল চুইংগাম বা লজেঞ্জে কাজ হয় না। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট কিছু ‘Non-Nicotine’ ওষুধ প্রেসক্রিপশন (Prescription) করেন। এই ওষুধগুলো মস্তিষ্কে তামাকের তৃষ্ণা কমাতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখবেন, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ সেবন হিতে বিপরীত হতে পারে।
কাউন্সিলিং ও বিহেভিয়ারাল থেরাপি
ধূমপান ত্যাগের লড়াইটি যতটা শারীরিক, তার চেয়েও বেশি মানসিক। তামাক ছাড়ার প্রচেষ্টায় অনেক সময় ডিপ্রেশন বা মানসিক চাপ তৈরি হয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রফেশনাল কাউন্সিলিং (Counseling) বা আচরণগত থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর। বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এখন ধূমপান ত্যাগের বিশেষ ক্লাস বা সাপোর্ট গ্রুপ থাকে, যেখানে অভিজ্ঞ মনোবিদরা আসক্তি কাটিয়ে ওঠার পথ দেখান।
সামাজিক ও পারিবারিক সমর্থন
একা কোনো যুদ্ধে জেতা কঠিন, কিন্তু প্রিয়জন পাশে থাকলে পথ চলা সহজ হয়। আপনি যখন ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন আপনার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং সহকর্মীদের বিষয়টি জানান। আপনার এই ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টায় তারা আপনাকে উৎসাহিত করবে। আপনার আশেপাশের মানুষ যখন জানবে আপনি ধূমপান ছাড়ছেন, তখন আপনার ওপর একটি নৈতিক দায়িত্ববোধ তৈরি হবে যা আপনাকে লক্ষ্য বিচ্যুত হতে দেবে না।
স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
অনেকেই মানসিক চাপ (Stress) কমাতে ধূমপান করেন। তাই ধূমপান ছাড়তে হলে চাপ কমানোর বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে। বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত যোগাসন (Yoga), প্রাণায়াম এবং মেডিটেশনের (Meditation) ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। নিয়মিত শরীরচর্চা করলে শরীরে এন্ডোরফিন (Endorphins) হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মনকে প্রফুল্ল রাখে এবং নিকোটিনের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া পছন্দের গান শোনা, বই পড়া কিংবা সৃজনশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখলে ধূমপানের চিন্তা মস্তিষ্ক থেকে দূরে থাকে।
পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ও ‘ট্রিগার’ ফ্যাক্টর বর্জন
ধূমপান ছাড়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আপনার চারপাশ থেকে ধূমপানের সব সরঞ্জাম—লাইটার, অ্যাশট্রে বা সিগারেটের প্যাকেট সরিয়ে ফেলুন। ঘর ও গাড়ি পরিষ্কার রাখুন যাতে তামাকের গন্ধ না থাকে। যেসব স্থান বা বন্ধুদের আড্ডায় গেলে আপনার ধূমপানের তীব্র ইচ্ছা জাগে, সেই ‘Trigger Factors’ গুলো সাময়িকভাবে এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
নিজেকে কিছুটা সময় দিন। মনে রাখবেন, একদিনেই সাফল্য আসবে না। ছোট ছোট লক্ষ্য স্থির করুন এবং প্রতিটি ধাপ পেরনোর পর নিজেকে পুরস্কৃত করুন। ধূমপানমুক্ত জীবন কেবল আপনার আয়ুই বাড়াবে না, বরং আপনার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।