এক সময় কেবল বিদেশি ফল হিসেবে পরিচিত থাকলেও, এখন বাংলাদেশের বাজারে স্ট্রবেরি বেশ সহজলভ্য। এর আকর্ষণীয় টকটকে লাল রং আর টক-মিষ্টি স্বাদ ছোট-বড় সবারই প্রিয়। তবে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তশর্করা আক্রান্ত রোগীদের মনে সব সময়ই একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়— ‘এই মিষ্টি ফলটি কি আমার স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ?’ আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল স্টাডি এই প্রশ্নের উত্তরে অত্যন্ত ইতিবাচক কিছু তথ্য প্রদান করেছে।
গবেষণার ফল: মিষ্টি হলেও কি রক্তে শর্করা বাড়ায়?
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, মিষ্টি স্বাদের ফল মানেই তাতে প্রচুর ক্যালরি এবং শর্করা থাকবে। কিন্তু স্ট্রবেরির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। ‘Antioxidants Journal’-এ প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত স্ট্রবেরি খাওয়া প্রি-ডায়াবেটিস (Pre-diabetes) আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা উন্নত করতে এবং শরীরের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কমাতে সহায়ক। গবেষণায় দেখা যায়, টানা ১২ সপ্তাহ প্রতিদিন এক কাপ করে স্ট্রবেরি খেলে শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ বাড়ে এবং ইনসুলিন রেসপন্স (Insulin Response) আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল হয়।
কেন স্ট্রবেরি হতে পারে আপনার ‘সুপারফুড’?
ডায়াবেটিস রোগীদের ডায়েট চার্টে স্ট্রবেরি অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে পুষ্টিবিদরা চারটি প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ উল্লেখ করেছেন:
১. লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (Low Glycemic Index): ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোনো খাবারের ‘Glycemic Index’ বা জিআই। স্ট্রবেরির জিআই বেশ কম (৪০-এর নিচে), যার অর্থ হলো এই ফলটি খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে লাফিয়ে বা স্পাইক করে বাড়ে না। এটি শরীরের ‘Metabolism’ বা বিপাক প্রক্রিয়ার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে না।
২. ফাইবারের উচ্চ উপস্থিতি: এক কাপ স্ট্রবেরিতে প্রায় ৩ গ্রাম ফাইবার থাকে। এই ‘Dietary Fiber’ পরিপাকতন্ত্রে শর্করার শোষণ প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, ফলে সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। এছাড়া এটি প্রাকৃতিকভাবে পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
৩. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্থোসায়ানিন: স্ট্রবেরিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি (Vitamin C) এবং অ্যান্থোসায়ানিন নামক এক ধরনের পিগমেন্ট। এই উপাদানগুলো রক্তনালীর স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস (Oxidative Stress) কমায়। ডায়াবেটিস রোগীদের হার্টের সমস্যা বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি থাকে বলে এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো তাদের জন্য বাড়তি সুরক্ষা কবজ হিসেবে কাজ করে।
৪. টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে ভূমিকা: ওকলাহোমা মেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, যারা নিয়মিত স্ট্রবেরি খান, তাদের ‘Type 2 Diabetes’ হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। এটি শরীরের দীর্ঘমেয়াদী গ্লুকোজ ম্যানেজমেন্টে দারুণ ভূমিকা রাখে।
সতর্কতা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
স্ট্রবেরি নিরাপদ হলেও এটি খাওয়ার ক্ষেত্রে ‘Portion Control’ বা পরিমিতিবোধ বজায় রাখা জরুরি। পুষ্টিবিদদের মতে, দিনে এক কাপ বা ৮-১০টি মাঝারি আকারের স্ট্রবেরি একজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য আদর্শ হতে পারে। সরাসরি ফল হিসেবে খাওয়া সবচেয়ে উপকারী, তবে এর সাথে বাড়তি চিনি বা ক্রিম যোগ করলে তা উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করবে।
সর্বোপরি, যারা ইনসুলিন নিচ্ছেন বা তীব্র ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাদের নতুন কোনো খাবার ডায়েটে যুক্ত করার আগে ব্যক্তিগত চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া উচিত।