গাজা উপত্যকার উত্তর অংশে অবস্থিত আল-বাতশ কবরস্থান। গত সোমবার (২৬ জানুয়ারি) এই পবিত্র স্থানটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। একটিমাত্র মৃতদেহ উদ্ধারের লক্ষ্যে ইসরাইলি সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিল আস্ত এক ট্যাংক বহর, আকাশে চক্কর দিচ্ছিল কিলার ড্রোন (Killer Drone), আর মাটির নিচে মাইন বা বাধা অপসারণে ব্যবহৃত হচ্ছিল অত্যাধুনিক ‘বিস্ফোরক রোবট’ (Explosive Robot)। পুরো একটি আবাসিক এলাকাকে ‘কিল জোন’ (Kill Zone) ঘোষণা করে চালানো এই অভিযানে তছনছ করা হয়েছে প্রায় ২০০টি ফিলিস্তিনি কবর।
এই বিশাল সামরিক কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রে ছিলেন রান গিভিলি। দুই বছরেরও বেশি সময় আগে নিহত হওয়া এই ইসরাইলি পুলিশ কর্মকর্তাকে গাজায় থাকা শেষ বন্দি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল তেল আবিব। শেষ পর্যন্ত সোমবার তার দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়, যাকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মরদেহের রাজনীতি: যেখানে মানবিকতা দুই ভাগে বিভক্ত
ইসরাইল যখন রান গিভিলির দেহাবশেষ ফরেনসিক টিম (Forensic Team) ও ডিএনএ ল্যাব (DNA Lab) ব্যবহার করে শনাক্ত করে হেলিকপ্টারে করে সসম্মানে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তার কয়েক মিটার দূরেই উন্মোচিত হয়েছে এক বীভৎস বাস্তবতা। ফিলিস্তিনিদের নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় কমিটির তথ্যমতে, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে আজও চাপা পড়ে আছে ১০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি মরদেহ।
পরিচয়হীন অবস্থায় পচে যাওয়া সেই দেহগুলোর জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্ধার অভিযান নেই, নেই কোনো আন্তর্জাতিক উদ্বেগ। তাদের উদ্ধারের জন্য কোনো ‘বিস্ফোরক রোবট’ আসে না, এমনকি ধ্বংসস্তূপ সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় হেভি মেশিনারি (Heavy Machinery) বা ভারী যন্ত্রপাতিও গাজায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
‘কিল জোন’ ও আগুনের দেয়াল: এক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান
গাজার সাংবাদিক খামিস আল-রিফি এই অভিযানের নৃশংসতা সচক্ষে দেখেছেন। তিনি জানান, ইসরাইলি ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট (Engineering Unit) প্রথমে বিমান হামলা ও ড্রোন ব্যবহার করে পুরো এলাকাটি অবরুদ্ধ করে ফেলে। এরপর সেখানে এমন এক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয় যে, সামান্য নড়াচড়া করলেই সরাসরি গুলি চালানো হচ্ছিল।
আল-রিফি বলেন, “ইসরাইলি বাহিনী তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা বাফার জোনের (Buffer Zone) কাছে কামান ও হেলিকপ্টারের গোলাবর্ষণে এক ‘আগুনের দেয়াল’ তৈরি করেছিল। এর ভেতরে বুলডোজার দিয়ে একে একে ২০০টি কবর খুঁড়ে ফেলা হয়। তারা প্রতিটি মরদেহ বের করে পরীক্ষা করছিল, যতক্ষণ না কাঙ্ক্ষিত ইসরাইলি দেহটি পাওয়া যায়।”
অভিযান শেষে যখন ইসরাইলিরা চলে যায়, তখন দেখা যায় ফিলিস্তিনিদের মরদেহগুলো এলোমেলোভাবে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, অনেকগুলো পড়ে আছে খোলা আকাশের নিচে। গিভিলির শরীর যখন হেলিকপ্টারে উড়ছিল, ফিলিস্তিনিদের শেষ চিহ্ন তখন বুলডোজারের দয়ার ওপর নিক্ষিপ্ত।
‘পৃথিবীর বৃহত্তম কবরস্থান’
ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভের মহাসচিব মুস্তাফা বারঘুতি এই ঘটনাকে ‘বর্ণবাদী মানসিকতার প্রতিফলন’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “যেকোনো পরিবারের অধিকার আছে তাদের স্বজনকে দাফন করার। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের যে মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে না, এই অভিযান তার বড় প্রমাণ।”
নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় কমিটির মুখপাত্র আলা উদ্দিন আল-আক্লুক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গাজা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। একদিকে ইসরাইলি বন্দিদের উদ্ধারে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের হাজার হাজার মানুষ ঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচে পচে যাচ্ছে, যাদের শেষ মর্যাদাটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”
লাশ খুঁজতে গিয়ে নতুন লাশের স্তূপ
এই অভিযানের সবচেয়ে বিয়োগান্তক অধ্যায়টি রচিত হয় মঙ্গলবার সকালে। ধ্বংসস্তূপে নিজের স্বজনের কবরের কী দশা হয়েছে, তা দেখতে গিয়েছিলেন স্থানীয়রা। ইসরাইলি সেনারা সেখানে ফের গুলি চালালে অন্তত চারজন বেসামরিক ফিলিস্তিনি নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক খামিস আল-রিফির আত্মীয় ইউসুফ আল-রিফি।
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে ২০২৬ সালে একটি পুরোনো লাশের খোঁজে নতুন করে কবর খনন ও প্রাণহানি যেন গাজার বর্তমান পরিস্থিতির এক নির্মম সারসংক্ষেপ। বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনামে এক পক্ষের জীবনের মূল্য প্রাধান্য পেলেও, অন্য পক্ষের অস্তিত্বের সংকট ঢাকা পড়ে থাকছে ধ্বংসস্তূপ আর মাটির গভীরে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা