দেশের ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে সংকটে পড়া পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের (Depositors) সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা ফেরতের ঘোষণা দেওয়া হলেও, চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন পুঁজিবাজারের (Stock Market) সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংকগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগ করা হাজারো মানুষের স্বার্থ রক্ষায় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি (BSEC) গত চার মাস আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দিলেও এখন পর্যন্ত মেলেনি কোনো সদুত্তর।
ভুয়া ব্যালেন্সশিট ও অডিট কারসাজির অভিযোগ
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই ব্যাংকগুলো যখন কার্যত দেউলিয়া হওয়ার পথে, তখনও কৃত্রিমভাবে সেগুলোকে 'সবল' দেখিয়ে শেয়ার লেনদেন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দাবি, অডিট ফার্মগুলোর (Audit Firms) দেওয়া অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি ব্যালেন্সশিটে ব্যাংকগুলোকে লাভজনক দেখানো হয়েছিল।
ইউনিয়ন ব্যাংকের একজন বিনিয়োগকারী মো. সাজ্জাদুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুমোদনের পরই ব্যাংকগুলো আইপিও (IPO) প্রক্রিয়ায় বাজারে এসেছে। আমরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর আস্থা রেখে শেয়ার কিনেছি। এখন অডিট রিপোর্টে জালিয়াতি পাওয়া গেলে তার দায়ভার সাধারণ বিনিয়োগকারী কেন নেবে? এর দায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অডিট ফার্মকেই নিতে হবে।”
বিএসইসির অসহায়ত্ব ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীরবতা
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায় বিএসইসি। চিঠিতে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে চার মাস পার হয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বিএসইসির পরিচালক আবুল কালাম আজাদ এই পরিস্থিতির জটিলতা স্বীকার করে বলেন, “ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টগুলো (Financial Statements) যখন ট্রাই-পার্টি মিটিংয়ের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছিল, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আমরাও তা পর্যবেক্ষণ করেছি। ব্যাংকগুলোর এই আর্থিক বিপর্যয়ের পেছনে বিনিয়োগকারীদের কোনো ভূমিকা নেই। তাই তাদের স্বার্থ রক্ষা করা নৈতিক দায়িত্ব।” তিনি আরও জানান, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত অডিট ফার্মগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এফআরসি (FRC) ও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: সুশাসনই ঘুরে দাঁড়ানোর চাবিকাঠি
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বড় শেয়ারহোল্ডার বা পর্ষদে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লুটপাটের দায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপানো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের (Policy Exchange of Bangladesh) চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, “সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতা ছিল না। যারা বোর্ডে বসে দুর্নীতি করেছেন, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে হলেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি সরকারের বিবেচনা করা উচিত।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী মনে করেন, ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “আর্থিক খাতে সুশাসন ফেরাতে হলে দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। জালিয়াতির মাধ্যমে যারা বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আস্থার সংকটে পড়বে।”
আমানতকারী বনাম বিনিয়োগকারী: বৈষম্যের চিত্র
সরকার ইতিমধ্যে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীকে তাদের গচ্ছিত অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কিন্তু শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি (Equity) বা বিনিয়োগের মূলধন ফেরত পাওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আইনি বা প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হয়নি। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না এলে পুঁজিবাজারের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধরনের ধস নামতে পারে।