নিজের দেশে নিরাপত্তাহীন প্রবাসী ও নাগরিকের প্রশ্ন
এটি কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভের নথি নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় সতর্কসংকেত। কারণ এখানে ব্যর্থ হওয়া মানে কেবল একজন নাগরিকের পরাজয় নয়, পুরো দেশের নৈতিক পরিকাঠামোর ভাঙন। যদি এই দখলদার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এখনই দাঁড়ানো না যায়, তাহলে দুর্নীতি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ভাষা হয়ে উঠবে। দখলদাররা বংশবিস্তার করবে, আর রাষ্ট্র ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।
যা লেখকের সঙ্গে ঘটছে, তা কোনো ব্যতিক্রম নয়। হাজারো পরিবারের সঙ্গে প্রতিদিন একই ঘটনা ঘটছে, শুধু তাদের কণ্ঠ শোনা যায় না। জমি আমার, খাজনা দিই আমি, অথচ ভোগ দখলে অন্যরা। এই রাজনীতির শিক্ষা তারা পায় নিজের পরিবার থেকেই। জোর-জুলুমের চর্চা শুরু হয় নিজের মানুষদের সঙ্গে। পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকলে ভয় দেখানো হয়, অনুপস্থিত থাকলে সবকিছু দখল করে নেওয়া হয়। প্রথমে কেয়ারটেকার, পরে নিজেকে মালিক ঘোষণা। তারা খাজনা দেয় না, কর দেয় না, অথচ সম্পত্তির একচ্ছত্র অধিকার ভোগ করে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও দায়মুক্তি
পরের জায়গা, পরের জমিনের ওপর ঘর তুলে বসবাস করা এই দখলদাররা ধীরে ধীরে ভুলে যেতে চায় যে সেই ঘরের প্রকৃত মালিক তারা নয়। আশ্চর্য বাস্তবতা হলো, লেখক নিয়ম মেনে খাজনা দিলেও তার জমিই নিলামে চলে যায়। অন্যদিকে দখলদাররা কোনো দায় নেয় না, কোনো জবাবদিহি করে না, তবু ক্ষমতার ছায়ায় নিরাপদ থাকে। বাংলাদেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতৃত্বই কোনো না কোনোভাবে অন্যের সম্পত্তি দখলের সঙ্গে জড়িত। এটি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা—ক্ষমতার সঙ্গে দখল জড়িয়ে গেছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে দায়মুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই অত্যাচারে পরিবারের সদস্যরা অতিষ্ঠ। এটি কেবল পারিবারিক বিরোধ নয়, এটি নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন। এই কারণেই লেখক নীরব থাকেননি। তিনি শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি দিয়েছেন, দুদকের কাছে লিখেছেন। এমনকি অতীতের সেনা প্রধানকেও অবগত করেছেন যে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যরা ক্ষমতা ও পরিচয় ব্যবহার করে কী ধরনের কুকর্মে জড়াচ্ছে। কিন্তু কোথাও প্রতিকার মেলেনি।
ন্যায়বিচারের শেষ অবলম্বন ও সতর্কবার্তা
লেখক জোর দিয়ে বলেন, তার অবস্থান দলভিত্তিক নয়, নৈতিক। যদি দেশে বিচার না থাকে, তবে রাষ্ট্রের কাছে তার শেষ প্রশ্ন এটি। যদি রাষ্ট্র নিজেই তদন্ত না করে, যদি দখলদার ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই অভিযোগ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের দরজায় যাবে। এটি কোনো হুমকি নয়, একজন নাগরিকের শেষ অবলম্বন।
লেখক প্রশ্ন রাখেন, এই দেশের জন্য আমরা লড়াই করি, নিয়মিত কর দিই, বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে রেমিট্যান্স পাঠাই, অথচ দেশের মালিকানা আমাদের নয়। আমরা কেবল ভাড়াটে। তাহলে আমাদের পরিচয় কী হবে—রেমিট্যান্স যোদ্ধা, না কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?
আমরা আর দুর্নীতিবাদী রাজনীতি, দুর্নীতিপরায়ণ পরিবারতন্ত্র, স্বৈরাচার কিংবা স্বৈরশাসনের মুখোমুখি হতে চাই না। ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। আমরা আমাদের স্বাধীনতা চাই, সার্বভৌমত্ব চাই। আমরা চাই এই রাষ্ট্র তার নাগরিককে রক্ষা করুক, দখলদারকে নয়। ক্ষমতার পরিচয় দেখে নয়, অপরাধের ভিত্তিতে বিচার হোক।
রাষ্ট্র যদি এই ন্যূনতম দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, যদি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস না দেখায়, তবে লেখকের শেষ আহ্বান, “দয়া করে অবিলম্বে সরে দাঁড়ান।”
ইতিহাস থেকে শিক্ষা: পতন ঘটাতে হবে চাঁদাবাজদের
ইতিহাস প্রমাণ করেছে, নাগরিক যখন শেষ আশাটুকুও হারায়, তখন সে আর কাগজে কলমে কথা বলে না, তখন সে রাজপথে ফিরে আসে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পতন ঘটেছিল, ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। ২০২৬ সালে পতন ঘটাতে হবে চাঁদাবাজদের। তবে এই লড়াইয়ে নামতে গিয়ে আমাদেরই যেন দুর্নীতিগ্রস্ত না হতে হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয়। ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে একই ভুল বারবার ফিরে আসে।