মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরও একটি শক্তিশালী নৌবহর বা ‘আর্মাডা’। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) আইওয়া অঙ্গরাজ্যে এক জনসভায় ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ (Carrier Strike Group) ইতোমধ্যেই অঞ্চলে মোতায়েন থাকলেও, ট্রাম্পের এই নতুন ঘোষণা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: ‘চুক্তি না করলে অস্তিত্বের সংকট’
আইওয়ার সমাবেশে ট্রাম্প তার চিরচেনা ভঙ্গিতে ইরানকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আরেকটি সুন্দর ‘আর্মাডা’ এখন দারুণভাবে ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়।” ট্রাম্পের মতে, ইরানের উচিত ছিল অনেক আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি চুক্তিতে আসা। তেহরানকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে তিনি আরও বলেন, “আশা করি তারা এবার চুক্তিতে সম্মত হবে। প্রথমবারেই তাদের চুক্তি করা উচিত ছিল, তাহলে আজ তাদের একটি স্থিতিশীল দেশ থাকত।”
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরান কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং তারা বারবার ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার চেষ্টা করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘এক্সিওস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, “আমাদের বিশাল নৌবহর এখন ইরানের দোরগোড়ায়। তারা এখন কথা বলতে চায়, আমাকে বারবার ফোন করছে।”
রহস্যময় নতুন নৌবহর ও সামরিক তৎপরতা
উল্লেখ্য, একদিন আগেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ জানিয়েছিল যে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প মঙ্গলবার যে ‘সুন্দর আর্মাডা’র কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি কি আগের মোতায়েন করা বাহিনী নাকি নতুন কোনো শক্তিশালী Combat Group, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। পেন্টাগন থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো কারিগরি তথ্য না আসলেও, বিশ্লেষকরা মনে করছেন এটি ইরানের ওপর ‘Maximum Pressure’ পলিসিরই অংশ।
তেহরানের অনড় অবস্থান: ‘যুদ্ধ চাই না, তবে পিছু হটব না’
মার্কিন এই সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মুখে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে ইরানও। সোমবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বিদেশি যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে (Defense Posture) কোনো পরিবর্তন আনবে না।
বাঘাই বলেন, “আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্বচ্ছ। ইরান কখনোই যুদ্ধকে স্বাগত জানায়নি, কিন্তু নিজের ভূখণ্ড রক্ষায় আমরা পিছপা হব না। কূটনীতি ও আলোচনার পথ আমরা সবসময় খোলা রেখেছি, যা আমরা অতীতে প্রমাণ করেছি।” তিনি আরও যোগ করেন, জনগণের সমর্থন নিয়ে দেশ রক্ষার পূর্ণ সক্ষমতা ইরানের রয়েছে এবং কোনো বিদেশি চাপ বা রণতরীর ভয় দেখিয়ে তাদের নীতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
কূটনৈতিক অস্থিরতা ও আগামীর সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে অনেকেই একটি বড় ‘Geopolitical Move’ হিসেবে দেখছেন। একদিকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে প্রচ্ছন্ন চাপ সৃষ্টি করা, অন্যদিকে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া—এই দ্বিমুখী কৌশলে ট্রাম্প ইরানকে কতটুকু নমনীয় করতে পারবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইরান যদি শেষ পর্যন্ত কোনো নতুন Nuclear Deal বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তিতে না আসে, তবে এই ‘আর্মাডা’ মোতায়েনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে এই অঞ্চলে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি এবং ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বয়ান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে নতুন কোনো সংঘাতের সূচনা করে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।