এক মায়ের অসহায়ত্ব: রোজমিডের নেপথ্যের গল্প
'রোজমিড' সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে ২০১৭ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসে প্রকাশিত সাংবাদিক ফ্র্যাঙ্ক শিয়ংয়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অবলম্বনে। এই বাস্তব ঘটনায় মায়ের নাম ছিল লাই হ্যাং। সিনেমায় 'আইরিন' চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী লুসি লিউ। তিনি এমন এক এশীয়-আমেরিকান মায়ের ভূমিকায়, যিনি সমাজের চোখে তাঁর ছেলের সিজোফ্রেনিয়া রোগের কথা লুকিয়ে রাখতে চান।
বাস্তবের লাই হ্যাং ও জর্জ
লাই হ্যাং তাঁর শৈশব কাটিয়েছেন লাওস ও হংকংয়ে। জাপানে গ্রাফিক ডিজাইনে পড়াশোনা শেষে ১৯৯২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং একটি সফল প্রিন্টিং ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে তাঁর ছেলে জর্জের জন্ম। ২০১২ সালে জর্জের বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই তার আচরণে পরিবর্তন আসে। বন্ধুরা থেকে দূরে সরে যাওয়া, মানসিক সমস্যায় ভোগা এবং একপর্যায়ে তার সিজোফ্রেনিয়া রোগ ধরা পড়ে।
সামাজিক চাপ ও মানসিক রোগের ট্যাবু
এশীয়-আমেরিকান সমাজে মানসিক রোগ নিয়ে কথা বলা তখনো ছিল এক প্রবল ট্যাবু। লাই হ্যাং মনে করতেন, এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বললে পরিবারকে চরম লজ্জার মুখে পড়তে হবে। ফলে তিনি কার্যত একাই ছেলের রোগের ভার বহন করতে থাকেন। সিনেমার আইরিনের মতো বাস্তবেও লাই হ্যাংয়ের চারপাশের নারীরা গুজব ছড়াতেন যে তাঁর ছেলে 'অশুভ শক্তিতে আক্রান্ত'। এই সামাজিক চাপ লাই হ্যাংয়ের মানসিক অবস্থাকে আরও ভেঙে দেয়।
ভয়াবহ আতঙ্ক ও শেষ আশঙ্কা
জর্জ হ্যালুসিনেশনে ভুগত, মৃত বাবাকে দেখত এবং অদৃশ্য কণ্ঠস্বর শুনত। স্কুলের মহড়ার সময় আতঙ্কিত হয়ে ছুটে বেরিয়ে যেত। একপর্যায়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, সে রাতে চুপিচুপি স্কুল ভবনে ঢুকছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় ছিল, জর্জ বিভিন্ন গণহত্যাকারীর বিষয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। ২০১৫ সালে চার্লস্টনে ডিলান রুফের গির্জায় গুলি চালানোর ঘটনার পর লাই হ্যাং চরম আতঙ্কে ভেঙে পড়েন। ঠিক তখনই তিনি জানতে পারেন যে তাঁর নিজের ক্যানসার আর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই জীবন কেড়ে নেবে।
বন্দুক কেনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
ছেলের ল্যাপটপে লাই হ্যাং স্কুল শুটিং নিয়ে অসংখ্য ওয়েবপেজ, অস্ত্রের স্পেসিফিকেশন, স্কুলের মানচিত্র এবং খুলি আঁকা ছবি দেখতে পান। এই সবকিছু তাঁকে নিশ্চিত করে যে ছেলেকে থামাতে হবে। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে লাই হ্যাং একটি হ্যান্ডগান কেনেন।
২৭ জুলাই ২০১৫, জর্জের জন্মদিনের দিনে লাই হ্যাং ছেলেকে নিয়ে এমন একটি মোটেলে ওঠেন যেখানে তাদের ছোটবেলার সুখের স্মৃতি ছিল। জর্জ ঘুমিয়ে পড়লে মা তার বুকে দুইবার গুলি করেন। পুলিশের নথি অনুযায়ী, এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে লাই হ্যাং ছেলের পাশে শুয়ে থাকেন। পুলিশকে তিনি বলেন, নিজের কাজের শাস্তি নিজে পেতে চেয়েই তিনি আত্মহত্যা করেননি।
কারাগার ও মৃত্যু
গ্রেপ্তারের পর কারাগারে থাকাকালে লাই হ্যাংয়ের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। তাঁর দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয় এবং তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বিচার শুরু হওয়ার আগেই মানবিক কারণে তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয়।
যে প্রশ্নটি রয়ে গেল
এই ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিকটি হলো, লাই হ্যাংয়ের সামনে আইনি বিকল্প পথ ছিল। আদালতের মাধ্যমে ছেলেকে তত্ত্বাবধানে নেওয়া বা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানোর সুযোগ থাকলেও সামাজিক ভয়, মানসিক চাপ ও সময়ের অভাব তাঁকে সেই পথে যেতে দেয়নি। 'রোজমিড' সিনেমাটি তাই মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক ট্যাবু এবং এক মায়ের অসহায়তার করুণ দলিল হিসেবে সামনে এসেছে।