মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ‘ছায়া যুদ্ধ’ (Shadow War) নতুন করে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের (Mossad) হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি এবং স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনায় নাশকতার পরিকল্পনার দায়ে আরও এক ইরানি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে তেহরান। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ভোরে দেশটির বিচার বিভাগ এই দণ্ড কার্যকরের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
হামিদরেজা সাবেত এসমাইলপুর নামে ওই ব্যক্তিকে মোসাদের ‘এজেন্ট’ হিসেবে অভিযুক্ত করে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইরানের বিচার বিভাগীয় সংবাদ সংস্থা ‘মিজান’ এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরটি প্রচার করেছে।
অভিযোগের নেপথ্যে: নাশকতামূলক তৎপরতা ও গোয়েন্দা তথ্য পাচার
হামিদরেজা এসমাইলপুরকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আদালতের নথিতে দাবি করা হয়েছে, তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় (Missile Installation) ‘নাশকতামূলক অভিযান’ বা Sabotage চালানোর উদ্দেশ্যে মোসাদের নির্দেশনায় কাজ করছিলেন। বিচার বিভাগ জানায়, এসমাইলপুর কেবল গোয়েন্দা তথ্যই সরবরাহ করেননি, বরং বিস্ফোরক বোঝাই যানবাহন স্থানান্তর এবং নাশকতার জন্য প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক সরঞ্জাম সংগ্রহের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তার এই তৎপরতা ইরানের ‘National Security’ বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
জুনের যুদ্ধ ও ইজরায়েলি অনুপ্রবেশের চিত্র
বিশ্লেষকদের মতে, গত ২০২৪ সালের জুনে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে সংঘটিত ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর থেকেই তেহরান তাদের অভ্যন্তরে থাকা ইজরায়েলি নেটওয়ার্ক নির্মূলে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ওই যুদ্ধের সময় ইজরায়েলি ‘Targeted Killing’ এবং নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চালানো ড্রোন হামলা ইরানের নিরাপত্তা বলয়ের দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরান। এর আগে গত ৭ জানুয়ারি আলি আরদেস্তানী নামে অপর এক ব্যক্তিকে একই অভিযোগে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল।
অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও মানবাধিকারের সংকট
ইরানের এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দেশটি অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ বর্তমানে ‘Anti-Government Movement’ বা ইসলামি প্রজাতন্ত্র বিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, চলমান এই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। ‘Iran Human Rights’ (IHR) নামক এনজিওর তথ্যমতে, চীন বাদে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার সর্বোচ্চ। গত এক বছরে দেশটিতে অন্তত ১,৫০০ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আইনি স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ‘নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি’ (Forced Confession)-র ভিত্তিতে অভিযুক্তদের দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইজরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার সন্দেহে গ্রেপ্তারকৃতদের ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং কঠোর করা হয়েছে।
তেহরান বরাবরই ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না এবং তাদের পরমাণু স্থাপনায় নাশকতা ও বিজ্ঞানীদের হত্যার জন্য মোসাদকেই দায়ী করে থাকে। জুনের যুদ্ধের পর ইরানের গোয়েন্দা বিভাগে ইজরায়েলি অনুপ্রবেশের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা ঢাকতেই তেহরান একের পর এক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে এক ধরনের ‘প্রতিরোধ বার্তা’ দিতে চাইছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।