মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitics) প্রেক্ষাপট প্রতি মুহূর্তে নাটকীয় মোড় নিচ্ছে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের হুমকির মুখে এবার বড় পদক্ষেপ নিল ক্রেমলিন। ইরানে কর্মরত নিজেদের পরমাণু বিজ্ঞানীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁদের দেশটিতে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে রাশিয়া। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) মস্কোর পক্ষ থেকে এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দেওয়া হয়।
মস্কোর চরম সতর্কতা ও ইভাকুয়েশন প্ল্যান
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক কর্পোরেশন (Rosatom)-এর প্রধান আলেক্সি লিখাচেভ জানিয়েছেন, তেহরানের ওপর মার্কিন হামলার আশঙ্কা প্রবল হওয়ায় তাঁরা পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিখাচেভ স্পষ্ট করেছেন যে, প্রয়োজন দেখা দিলেই ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে (Nuclear Power Plant) কর্মরত রুশ বিশেষজ্ঞদের সরিয়ে নেওয়া হবে।
লিখাচেভ বলেন, "আমরা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছি। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে আমাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার (Evacuation) সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।"
বুশেহর: রাশিয়ার কারিগরি সহায়তার প্রাণকেন্দ্র
বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্রটি ইরানের জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেশটির একমাত্র সচল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটি পুরোপুরি রাশিয়ার কারিগরি ও প্রকৌশলগত সহায়তায় নির্মিত। গত বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছিলেন, সেখানে কয়েকশ রুশ ইঞ্জিনিয়ার ও বিশেষজ্ঞ বর্তমানে কর্মরত। বর্তমানে এই সাইটে রাশিয়া আরও কয়েকটি নতুন নিউক্লিয়ার ইউনিট (Nuclear Unit) নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এই কেন্দ্রটি লক্ষ্যবস্তু না হলেও, এবার ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে মস্কো কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
'চেরনোবিল' ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা
পেশাদার কূটনীতির বাইরেও একটি মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন আলেক্সি লিখাচেভ। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো হলে তা ১৯৮৬ সালের ইউক্রেনের চেরনোবিল (Chernobyl) পারমাণবিক দুর্ঘটনার মতো ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। একটি সচল পারমাণবিক চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটলে তার তেজস্ক্রিয়তা কেবল ইরানে নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ট্রাম্পের 'নৌ-অভিযান' ও তেহরানের পাল্টা অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা গুঁড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যালে' (Truth Social) এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, একটি শক্তিশালী নৌবহর ও এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার (Aircraft Carrier) অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই নৌবহর যেকোনো মুহূর্তে তাদের 'মিশন' সম্পন্ন করতে সক্ষম।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই সামরিক আল্টিমেটামকে (Ultimatum) সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সাফ জানিয়েছেন, তেহরান কোনো ধরণের জবরদস্তির কাছে মাথা নত করবে না এবং তাদের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে তিনি এও যোগ করেন যে, সম্মানজনক ও ন্যায্য চুক্তির টেবিলে বসতে ইরানের কোনো আপত্তি নেই, যদি সেখানে হুমকির কোনো স্থান না থাকে।
এখন দেখার বিষয়, রাশিয়ার এই বিজ্ঞানী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কি সত্যিই একটি বড় ধরণের সংঘাতের পূর্বাভাস, নাকি কেবলই কৌশলগত সতর্কতা। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের দিকে।