বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে যেন এক মহানাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার যেখানে মূল্যবান এই ধাতুর দাম ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫৯৪ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল, ঠিক তার পরদিনই দেখা দিল বড় ধরনের ধস। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম এক ধাক্কায় ৫.৯১ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫৫ ডলারের ঘরে নেমে এসেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—স্বর্ণের এই পতন কি দীর্ঘস্থায়ী হবে, নাকি এটি নতুন কোনো উল্লম্ফনের আগের সাময়িক বিরতি?
কেন এই আকস্মিক পতন? বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের এই দরপতনের পেছনে কাজ করছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের (Fed) পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে কেভিন ওয়ার্শের নাম আলোচনায় আসায় বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার জানান, “ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে অপেক্ষাকৃত নমনীয় (Dovish) কাউকে নিয়োগের সম্ভাবনা এবং মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি করেছে। এছাড়া দীর্ঘদিনের ঊর্ধ্বগতির পর অনেক বিনিয়োগকারী তাদের মুনাফা তুলে নিচ্ছেন (Profit Booking), যা এই সাময়িক সংশোধনের (Market Correction) মূল কারণ।”
স্টোনএক্সের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যাট সিম্পসনের মতে, কেভিন ওয়ার্শ বর্তমান চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন—এই খবরে এশীয় বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্বর্ণের দামে।
দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণ কি আরও চড়বে? দামের এই পতনকে অনেক বিশেষজ্ঞই স্বর্ণ কেনার ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন। আইজি মার্কেটের বিশ্লেষক টনি সাইকামুর মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক স্বর্ণ ক্রয় এবং নিরাপদ বিনিয়োগ বা ‘Safe Haven’ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি ক্রমবর্ধমান আস্থা এই বাজারকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শক্তিশালী রাখবে। তাঁর মতে, এটি কেবল একটি সাময়িক ‘Price Correction’, পতনের কোনো দীর্ঘমেয়াদী সংকেত নয়।
৬ হাজার ডলারের মাইলফলক কি আসন্ন? বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বর্ণের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী।
UBS-এর পূর্বাভাস: বহুজাতিক ব্যাংক ইউবিএস ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৬ হাজার ২০০ ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখছে। এমনকি অনুকূল পরিস্থিতি থাকলে এটি ৭ হাজার ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
ডয়চে ব্যাংক ও সোসিয়েট জেনারেল: এই দুই প্রতিষ্ঠানই মনে করছে ২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম ৬ হাজার ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করবে। বিনিয়োগকারীরা অস্থির ডলারের চেয়ে বাস্তব সম্পদ (Real Asset) হিসেবে স্বর্ণকেই বেশি নিরাপদ মনে করছেন।
ইতিহাসের পাতায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি চলতি বছরের জানুয়ারি মাসটি স্বর্ণের বাজারের জন্য এক ঐতিহাসিক মাস হয়ে থাকবে। মাত্র এক মাসেই স্বর্ণের দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা ১৯৮০ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ মাসিক প্রবৃদ্ধি। টানা ছয় মাস ধরে লাভের মুখ দেখছে এই বাজার।
পরিশেষে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বলছে—বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) এবং ফেড-এর সুদের হার সংক্রান্ত নীতিমালার ওপর নির্ভর করবে স্বর্ণের পরবর্তী গতিপথ। তবে বিশ্লেষকদের বড় অংশই একমত যে, আজকের এই পতন কেবল একটি সাময়িক বিরতি; স্বর্ণের দাম অদূর ভবিষ্যতে নতুন কোনো রেকর্ড গড়ার পথেই রয়েছে।