• মতামত
  • জালিয়াতি ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব: প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে কঠোর আইনের দাবি

জালিয়াতি ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব: প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে কঠোর আইনের দাবি

ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপোতে ড. ইউনূসের মন্তব্য: জালিয়াতির দায়ভার সীমিত গোষ্ঠীর, কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যর্থতা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সদিচ্ছার অভাব প্রমাণ করে। দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই ভাবমূর্তি রক্ষার একমাত্র পথ।

মতামত ১ মিনিট পড়া
জালিয়াতি ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব: প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে কঠোর আইনের দাবি

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি 'ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬'-এ দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশকে 'জালিয়াতির জন্য বিশ্বজুড়ে কুখ্যাত' বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর এ মন্তব্য দেশের প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা ও সংকট উভয়কেই কঠিন বাস্তবতায় তুলে ধরেছে। তবে প্রশ্ন হলো, মুষ্টিমেয় জালিয়াতের অপকর্মের দায় কি পুরো জাতির? এ প্রবন্ধের মূল সুর হলো—অপরাধীর দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে এবং কঠোর শাস্তির মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে হবে।

ড. ইউনূসের বক্তব্যের সারমর্ম

বুধবার (৩০ জানুয়ারি ২০২৬) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) অনুষ্ঠিত 'ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬'-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি স্পষ্টভাষায় বলেন, 'জালিয়াতির জন্য বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে কুখ্যাত হয়ে উঠেছে।' এ মন্তব্য নিঃসন্দেহে অনেককেই নাড়া দিয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার প্রমাণ করে বাংলাদেশিরা মেধা ও সৃজনশীলতার অধিকারী, কিন্তু সেই মেধা ভুল পথে পরিচালিত হওয়ায় এর দায়ভার রাষ্ট্রকেই নিতে হচ্ছে।

জালিয়াতির দায় কার, রাষ্ট্রের ভূমিকা কী?

বাস্তবতা হলো, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত একটি সীমিত গোষ্ঠী, যারা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। কিন্তু ভুয়া নথিপত্র, ডিজিটাল প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি বা অনলাইন স্ক্যামের মাধ্যমে তাদের অপকর্মের প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ ও বহুমাত্রিক। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রতি যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, তার দায়ভার কখনোই সারা দেশের সাধারণ মানুষের হতে পারে না; এটি কতিপয় অপরাধীর কাজ। প্রশ্ন ওঠে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সাইবার ক্রাইম ইউনিট থাকা সত্ত্বেও কেন এ অল্পসংখ্যক জালিয়াতকে প্রতিহত করতে সরকার ব্যর্থ?

প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব

এ সমস্যার মূলে রয়েছে কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা, জবাবদিহির অভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সংকট। প্রযুক্তি জনগণের সহায়ক হওয়ার কথা, শোষণের হাতিয়ার নয়। তাই প্রযুক্তিকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে এর অপব্যবহারকারীরা যেন কঠোরভাবে আইনের আওতায় আসে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োজনীয়তা

জালিয়াতির মাধ্যমে যারা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে শুধু মামলার খাতা খোলা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হলো 'দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি'। দ্রুত বিচার, স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রকাশ্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সমাজে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়—জালিয়াতির কোনো ভবিষ্যৎ নেই। যদি কয়েকজন অপরাধী বছরের পর বছর পার পেয়ে যায়, তাহলে একদিকে সৎ নাগরিকদের মধ্যে হতাশা জন্মায়, অন্যদিকে অপরাধীরা আরও বেশি সাহসী হয়ে ওঠে।

চিন্তাগত দূরত্ব ও নেতৃত্বের সংকট

অধ্যাপক ইউনূস 'চিন্তায় পিছিয়ে থাকা'র যে কথা বলেছেন, তা একটি বড় সংকট। ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা শুধু অনলাইন ফরম বা অ্যাপ নয়; এটি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানবিক প্রশাসনের প্রতীক। সরকার যদি সত্যিই জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে পারে, তবে দালালচক্র, জালিয়াত ও মধ্যস্বত্বভোগীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কোণঠাসা হবে। এছাড়াও, তরুণরা প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও নেতৃত্বে তাদের অনুপস্থিতি এবং বয়স্ক নেতৃত্বের প্রযুক্তির গতি বুঝতে না পারার যে প্রজন্মগত দূরত্ব, তা এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।

উপসংহার: ন্যায়বিচার ও শাসনের দৃঢ়তা

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অপরাধীকে চিহ্নিত করা, কঠোর শাস্তি দেওয়া এবং সৎ মানুষের জন্য একটি সুগম পথ তৈরি করা। প্রযুক্তি-নির্ভর ভবিষ্যৎ গড়তে হলে সবার আগে প্রয়োজন ন্যায়বিচার ও শাসনের দৃঢ়তা। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা আসলে সব উন্নয়নমূলক এক্সপো, উদ্যোগ ও প্রতিপাদ্যকে কেবল শোভা বা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করবে। দেশবাসীরা কোনো জালিয়াতির কারখানা নয়, বরং মেধা ও সৃজনশীলতার প্রতীক হিসেবে বিশ্বে পরিচিত হতে চায়।

Tags: corruption fraud digital bangladesh governance muhammed yunus digital innovation state responsibility technology abuse