• মতামত
  • ভোটারই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি: নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার

ভোটারই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি: নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল ব্যক্তি বা দলের জয়-পরাজয় নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ। সচেতন ভোটের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ ও অপশক্তির প্রত্যাখ্যান সম্ভব, যেখানে ভোটারই প্রকৃত নায়ক।

মতামত ১ মিনিট পড়া
ভোটারই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি: নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি ভোটের তারিখ নয়, বরং এটি নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ভোটারই ক্ষমতার প্রকৃত উৎস। এই ঐতিহাসিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সচেতন, দৃঢ় ও নৈতিকতাসম্পন্ন প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমেই শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব, যেখানে কোনো অপশক্তি টিকে থাকতে পারবে না।

আর মাত্র ১০ দিন পরই আসছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম জাতিই আছে, যারা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে। আমরা সেই গর্বিত জাতি। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শিখিয়েছে—অধিকার কেউ দয়া করে দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয়। সেই ঐতিহাসিক চেতনাকে ধারণ করেই আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি। এই লড়াইয়ের একমাত্র নায়ক কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা নন, নায়ক হলেন ভোটার নিজেই

গণতন্ত্রে ভোটারের ক্ষমতা ও ব্যালটের শক্তি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ভোটারই ক্ষমতার প্রকৃত উৎস। সংবিধান, রাষ্ট্র, সরকার—সবকিছুর বৈধতা আসে ভোটারদের সম্মতি থেকে। তাই ভোটার যত সচেতন, যত দৃঢ়, তত শক্তিশালী হয় গণতন্ত্র। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সেই সত্যটিকেই আবার আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। গণতন্ত্রে ব্যালট কেবল একটি কাগজের টুকরো নয়, বরং এটি নীরব বিপ্লবের হাতিয়ার। এই ব্যালট দিয়েই চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, দখলবাজ, মাদক-সন্ত্রাসী, অন্যায়কারী, বিতর্কিত ব্যক্তি কিংবা ঋণখেলাপিদের রুখে দেওয়া যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যখন মানুষ সচেতনভাবে ভোট দেয়, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী অপশক্তিও পরাজিত হয়।

আমরা প্রায়ই দেখি, হাজার কোটি টাকার মালিক, প্রভাবশালী রাজনীতিক কিংবা ক্ষমতাধর ব্যক্তি নির্বাচনের সময় একজন সাধারণ ভোটারের দরজায় গিয়ে দাঁড়ান। গায়ে কাদা-মাটি মাখা কৃষক, দিনমজুর কিংবা খেটে খাওয়া মানুষটির হাত ধরেন, কুশল বিনিময় করেন। এই দৃশ্যই সবচেয়ে বড় প্রমাণ—গণতন্ত্রে একজন ভোটারের গুরুত্ব কতটা। দিনের শেষে যত বড় নেতা বা ধনীই হোন না কেন, ভোটারের কাছেই তাকে ভোট ভিক্ষা করতে হয়। ভোটার যদি নিজের শক্তি বোঝেন, তবে কোনো অন্যায়কারী টিকে থাকতে পারে না।

ভোটাধিকার ও নাগরিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতায় ভোটাধিকার প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘ সময় ধরে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন, অনিয়ম, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ও অংশগ্রহণহীনতার অভিযোগে মানুষের আস্থা বারবার নষ্ট হয়েছে। বহু মানুষ কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন—কখনো ভয়, কখনো অনাস্থা, কখনো আবার ভোটের অর্থহীনতার কারণে। ১২ ফেব্রুয়ারি সেই বঞ্চিত মানুষের জন্য একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগ মানে কেবল একটি ভোট দেওয়া নয়; এটি নিজের নাগরিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের দিন। যারা দীর্ঘদিন ভোট দিতে পারেননি বা ভোট দিয়ে কিছু হয় না বলে ভাবতেন, তাদের জন্য এই নির্বাচন একটি পরীক্ষা এবং সম্ভাবনা।

প্রার্থী বাছাইয়ে নৈতিকতার পরীক্ষা ভোটারদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কাকে ভোট দেবেন? গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার খেলা নয়, এটি নৈতিকতারও পরীক্ষা। এমন প্রার্থী বেছে নেওয়াই ভোটারের দায়িত্ব, যিনি বিতর্কমুক্ত, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত নন, দখলবাজ বা ঋণখেলাপি নন, দুর্নীতি ও মাদকের পৃষ্ঠপোষক নন। কারণ ভুল নেতৃত্ব মানেই ভুল ভবিষ্যৎ। ভোটার আজ অসচেতন হলে বা অর্থ, প্রলোভন বা ভয়ের কাছে হার মানলে এর ফল পুরো একটি প্রজন্মকে ভোগ করতে হবে। নাগরিক জীবনে অন্ধকার নেমে আসতে পারে, আইনের শাসন দুর্বল হবে, নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এই ভোট কেবল ব্যক্তি বা দলের জয়-পরাজয় নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের চলার পথ নির্ধারণ করবে।

সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরেশোরে চললেও দুঃখজনকভাবে নির্বাচনী প্রচারণার সঙ্গে সহিংসতার খবরও সামনে আসছে। হামলা, ভাঙচুর, সংঘর্ষ—এসব ঘটনা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ভোটারদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে, যা গণতন্ত্রের শত্রু। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব অত্যন্ত বড়। নির্বাচন কমিশনকে হতে হবে দৃঢ় ও নিরপেক্ষ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিশ্চিত করতে হবে ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা। রাজনৈতিক দলগুলোকেও সংযম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ভোটার নিরাপদ বোধ না করলে ভোটের বৈধতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং ভবিষ্যতের ঘোষণা আজকের বিশ্বে কোনো নির্বাচন আর কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি থাকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পথ সুগম করে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হলে, তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে বিবেচিত হবে। এই মানদণ্ড পূরণের কেন্দ্রে রয়েছেন ভোটাররাই।

এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রার্থী বাছাই, প্রতিশ্রুতি যাচাই, অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ—সবকিছুই এখন ভোটারের দায়িত্ব। আবেগ নয়, যুক্তি; গুজব নয়, তথ্য; ভয় নয়, সাহস—এই তিনটি বিষয় মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকেন্দ্রে যাওয়া মানে শুধু ব্যালটে সিল মারা নয়; এটি একটি ঘোষণার দিন—"আমি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন, আমি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না।” এই নির্বাচনে প্রতিটি ভোটারই একেকজন নায়ক, যাদের হাতেই আছে সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণকর সমাজ গড়ে তোলার সিদ্ধান্তের ক্ষমতা। এর ব্যত্যয় হলে আবারও ফিরে আসতে পারে সেই পুরনো ফ্যাসিবাদ।

Tags: bangladesh election democracy voter power kalbela-opinion political ethics february 12 election