৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট কেন?
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত ১৫ জানুয়ারি ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের বিন আবিয়াহ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সৌদি আরবে অবস্থানরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রদান সংক্রান্ত কাজের অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন। জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এ বিষয়ে 'যথেষ্ট অগ্রগতি' হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন এবং কাজ দ্রুত ত্বরান্বিত করতে বিশেষ টিম পাঠানোর কথাও জানান।
এই সংবাদ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উল্লিখিত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট প্রদানের বিষয়ে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে আরও আগেই সমঝোতা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষ বা গণমাধ্যম আগে জানতে পারেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গোপনে হলেও কাজটি জোরেশোরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার ও অর্থনৈতিক চাপ
প্রশ্ন হলো, প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভারে জর্জরিত বাংলাদেশ কেন নতুন করে আরও ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার কাজ করছে? এ ধরনের একটি গুরুতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কি অন্তর্বর্তী সরকারের আছে? অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমেই নিম্নমুখী (২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৪.২% থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৮%)। কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নাজুক। এমন পরিস্থিতিতে ৬৯ হাজার নতুন রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দিয়ে বাংলাদেশ তাদের কোথায় জায়গা দেবে—এ প্রশ্ন প্রধান উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে।
প্রশ্নবিদ্ধ বৈদেশিক নীতি
রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট প্রদানের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যান্য কিছু বৈদেশিক চুক্তি ও উদ্যোগও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ অ্যাগ্রিমেন্ট (আরটিএ) স্বাক্ষর, বিনা দরপত্রে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ, বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে বন্দর ইজারাদান, পাকিস্তানের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান ক্রয় এবং গাজার তথাকথিত 'শান্তি পর্ষদে' বাংলাদেশের যোগদান প্রয়াস। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির পরিবর্তে এই অতিবিতর্কিত বৈদেশিক চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে সরকারের ব্যস্ততা জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে অবহেলা ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
গুঞ্জন রয়েছে যে, তথাকথিত সংস্কারের নামে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বড় অংশ নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিল এবং প্রকৃত কোনো সংস্কার হয়নি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের মতো নাজুক বিষয়টিও নানা অসত্য ও অস্বচ্ছ কথার মারপ্যাঁচে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ১৫ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা বহনের সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। তাদের বাংলাদেশে অবস্থানের কারণে আর্থসামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে এবং নানা আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার কারণে রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের প্রকৃত চেষ্টা না করে নতুন করে ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট প্রদান এবং সীমান্ত শিথিল রেখে আরও রোহিঙ্গাকে দেশে ঢুকতে দেওয়ার যে 'আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত' বাংলাদেশ নিয়েছে, তা শুধু অপরিণামদর্শীই নয়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র বর্তমান অবয়বে টিকে থাকতে পারবে কি না, সে বিষয়ে মৃদু প্রশ্ন উঠছে।
সরকারের প্রতি অনুরোধ
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অনুরোধ, সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট প্রদান এবং মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত শিথিল রাখার সিদ্ধান্ত দ্রুত পরিত্যাগ করা হোক। বরং নিজেদের তৈরি জঞ্জালগুলো যতটা সম্ভব সাফসুতরা করে রেখে যাওয়ার কাজে মনোনিবেশ করা হোক, যাতে পরবর্তী সরকার দায়িত্বে এসে নতুন কাজে হাত দিতে পারে। অন্যথায় নতুন সরকারের সময়ের একটি বিরাট অংশ এই আবর্জনা পরিষ্কারে চলে যাবে, যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।