বয়স ৩৮ ছুঁইছুঁই, কিন্তু কোর্টে তাঁর জেদ যেন বিশের তরুণের চেয়েও ধারালো। প্রতিপক্ষ যখন গত দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ইয়ানিক সিন্নার, তখন লড়াইটা যে স্নায়ুচাপের হবে, তা অনুমেয়ই ছিল। প্রায় ৪ ঘণ্টার এক ম্যারাথন সেমিফাইনালে টেনিস বিশ্ব দেখল নোভাক জোকোভিচের সেই চিরচেনা রূপ— হারার আগে হার না মানার অদম্য মানসিকতা। প্রথম তিন সেটের দুটিতে হেরে খাদের কিনারে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ালেন এই সার্বিয়ান কিংবদন্তি। তরুণ তুর্কি সিন্নারকে স্তব্ধ করে দিয়ে আরও একবার গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে নিজের জায়গা করে নিলেন ‘বুড়ো’ জোকোভিচ।
হার মানেনি চ্যাম্পিয়ন ডিএনএ
ম্যাচের শুরুটা জোকোভিচের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। ২৪ বছর বয়সী ইতালিয়ান তারকা ইয়ানিক সিনারের গতির কাছে বারবার খেই হারাচ্ছিলেন তিনি। একটা সময় মনে হচ্ছিল, শরীর আর সায় দিচ্ছে না। অনেকগুলো সার্ভ নিতে তাঁর অনীহা দেখে গ্যালারিতে কানাঘুষা শুরু হয়েছিল— তবে কি ফুরিয়ে গেলেন জোকার? কিন্তু দিনশেষে এটিই জোকোভিচ। ৩-৬, ৬-৩, ৪-৬, ৬-৪ ও ৬-৪ সেটের এই জয় কেবল শারীরিক শক্তির নয়, বরং মগজের লড়াইয়েও তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।
অথচ এই টুর্নামেন্টেই তাঁর যাত্রা শেষ হতে পারত কোয়ার্টার ফাইনালে। ইনজুরির কারণে লরেঞ্জো মুসেত্তি ওয়াকওভার না দিলে হয়তো বাড়ি ফেরার টিকিট কেটেই ফেলেছিলেন। ভাগ্যের সহায়তা আর নিজের অবিশ্বাস্য ‘রিলেন্টলেস’ পারফরম্যান্সের মিশেলে তিনি এখন রড লেভার অ্যারেনার রাজা হিসেবে ফাইনালে।
সিনারের আধিপত্যের অবসান
ইয়ানিক সিনারের জন্য এই হার বড় এক ধাক্কা। ২০২৪ এবং ২০২৫—টানা দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি। মেদভেদেভ ও জভেরেভকে হারিয়ে মেলবোর্নে নিজের সাম্রাজ্য গড়েছিলেন এই ইতালিয়ান। গত দুই বছরে যেখানে জোকোভিচ সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছিলেন, সেখানে সিনার ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু এবার সেই অপ্রতিরোধ্য যাত্রায় দাঁড়ি টেনে দিলেন টেনিসের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ‘ফিনিশার’।
রেকর্ড গড়া আলকারাজ ও রোববারের মহারণ
আগামী রোববারের ফাইনালে জোকোভিচের জন্য অপেক্ষা করছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। জভেরেভকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছেন স্প্যানিশ সেনসেশন কার্লোস আলকারাজ। সেমিফাইনালে ৬-৪, ৭-৬ (৭-৫), ৬-৭ (৪-৭) ও ৭-৫ গেমে জিতে আলকারাজ গড়েছেন অনন্য এক বিশ্ব রেকর্ড। টেনিস ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে চারটি গ্র্যান্ড স্লামেরই (ফ্রেঞ্চ ওপেন, উইম্বলডন, ইউএস ওপেন ও অস্ট্রেলিয়ান ওপেন) ফাইনালে ওঠার কীর্তি গড়েছেন তিনি। ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬টি শিরোপা জেতা আলকারাজের ট্রফি ক্যাবিনেটে কেবল অস্ট্রেলিয়ান ওপেনটিই নেই।
ইতিহাসের হাতছানি: ২৫তম গ্র্যান্ড স্লামের পথে
রোববারের ফাইনাল কেবল একটি শিরোপার লড়াই নয়, বরং টেনিসের দুই প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। জোকোভিচ লড়ছেন নিজের ১১তম অস্ট্রেলিয়ান ওপেন এবং রেকর্ড ২৫তম গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপার জন্য। রাফায়েল নাদালকে আগেই টপকে যাওয়া এই সার্বিয়ানের লক্ষ্য এখন নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, যা ছোঁয়া ভবিষ্যতের টেনিস তারকাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, তরুণ আলকারাজ চাইবেন ‘কিং অফ মেলবোর্ন’-কে তাঁর নিজের ডেরাতেই সিংহাসনচ্যুত করতে।
সব মিলিয়ে টেনিস প্রেমীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এক হাই-ভোল্টেজ মেগা ফাইনালের জন্য।