বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দাপট এখন প্রশ্নাতীত। তবে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এবার বড় হয়ে উঠছে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট ‘দ্য হান্ড্রেড’ (The Hundred)-এর আসন্ন নিলামকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। গুঞ্জন উঠেছে, আইপিএল (IPL) সংশ্লিষ্ট চারটি ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের দলে কোনো পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে নেবে না। বিবিস স্পোর্টস-এর এই খবরের পর থেকেই ইংল্যান্ডের ক্রিকেট মহলে বইছে সমালোচনার ঝড়। বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেন না হ্যারি ব্রুক কিংবা মাইকেল ভনের মতো তারকারা।
আইপিএল কানেকশন ও মালিকানাধীন চার দল দ্য হান্ড্রেড-এর কাঠামোতে সম্প্রতি বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রতিযোগিতার বেশ কয়েকটি দলের মালিকানা বা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এখন আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর হাতে। বিতর্কিত এই তালিকায় রয়েছে— ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টস (যার ৭০ শতাংশ মালিকানা লখনউ সুপার জায়ান্টসের সঞ্জীব গোয়েঙ্কা গ্রুপের), এমআই লন্ডন (রিলায়েন্স গ্রুপের ৪৯ শতাংশ মালিকানা), সানরাইজার্স লিডস (সান গ্রুপের একক মালিকানা) এবং সাউদার্ন ব্রেভ (জিএমআর গ্রুপের ৪৯ শতাংশ মালিকানা, যারা আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালসের মালিক)।
২০০৯ সাল থেকে আইপিএলে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এবার সেই একই ছায়া ইংল্যান্ডের মাটিতেও পড়তে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘Diplomatic’ ও ‘Commercial’ টানাপোড়েন।
‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য হ্যারি ব্রুকের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সুপার এইটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি উষ্মা প্রকাশ করেছেন ইংল্যান্ডের বর্তমান অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। তিনি মনে করেন, পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা মাঠে দর্শক টানার অন্যতম কারিগর। ব্রুক বলেন, "নিলামে প্রায় ৬০ জনের মতো পাকিস্তানি ক্রিকেটার নিবন্ধিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিশ্বসেরা কিছু প্রতিভা রয়েছে। যদি রাজনৈতিক কারণে তাঁদের সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত লজ্জাজনক। তাঁরা এই টুর্নামেন্টকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার ক্ষমতা রাখেন।" ব্রুকের এই খোলামেলা মন্তব্য মূলত ‘Franchise Cricket’-এর ওপর ভারতীয় মালিকদের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধেই এক প্রচ্ছন্ন বার্তা।
মাইকেল ভনের কড়া সমালোচনা ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (X) নিজের কঠোর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের (ECB) উচিত দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করা। ভন মনে করেন, ইংল্যান্ডের ঘরোয়া টুর্নামেন্টে বাইরের কোনো দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা প্রভাব কার্যকর হওয়া কাম্য নয়। তাঁর মতে, "এটি ঘটতে দেওয়া উচিত নয়।" ক্রিকেটের স্পিরিট বজায় রাখতে মেধা অনুযায়ী খেলোয়াড় নির্বাচনের পক্ষে সওয়াল করেছেন তিনি।
নিলাম ও অনিশ্চয়তা আগামী ১১ ও ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘দ্য হান্ড্রেড’-এর মেগা নিলাম। ষাটের বেশি পাকিস্তানি ক্রিকেটার এতে নাম নিবন্ধন করেছেন, যাঁদের মধ্যে বাবর আজম, শাহীন আফ্রিদি ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের মতো তারকারা রয়েছেন। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর এই ‘Global Footprint’ যদি খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে, তবে তা ক্রিকেটের মুক্ত বাজারের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইংল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম ও ক্রিকেট ভক্তদের একাংশ মনে করছেন, যদি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের এড়িয়ে চলা হয়, তবে ‘দ্য হান্ড্রেড’-এর জৌলুস যেমন কমবে, তেমনি ইসিবি-র সার্বভৌমত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। মাঠের ক্রিকেট বনাম করপোরেট রাজনীতি— এই লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসে, তা জানতে ১১ মার্চের নিলাম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।