মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা আর ইরানকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিল যুক্তরাষ্ট্র। আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের কাছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র বিক্রির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। এই বিশাল সামরিক প্যাকেজের আওতায় রয়েছে শক্তিশালী ‘অ্যাপাচি’ (Apache) অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং ‘প্যাট্রিয়ট’ (Patriot) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ইসরায়েলের জন্য ‘অ্যাপাচি’ ও ট্যাকটিক্যাল ভেহিকল
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইসরায়েলের কাছে ৩০টি ‘এএইচ-৬৪ই’ (AH-64E) অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। এই চুক্তির মোট অর্থমূল্য ধরা হয়েছে ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওয়াশিংটনের মতে, ইসরায়েলের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার (National Interest) অবিচ্ছেদ্য অংশ।
হেলিকপ্টারের পাশাপাশি ইসরায়েলকে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের ‘জয়েন্ট লাইট ট্যাকটিক্যাল ভেহিকল’ (Joint Light Tactical Vehicle) দেওয়ার পরিকল্পনাও অনুমোদিত হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিলেও এই নির্দিষ্ট চুক্তিগুলো মূলত সরাসরি বিক্রয় প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত।
সৌদির আকাশসীমায় ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্রের সুরক্ষা
মধ্যপ্রাচ্যের আরেক প্রভাবশালী শক্তি সৌদি আরবের জন্যও বড় সামরিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে বাইডেন-ট্রাম্প অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষমতার সন্ধিক্ষণে থাকা মার্কিন প্রশাসন। ৯ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তির অধীনে রিয়াদকে ৭৩০টি ‘প্যাট্রিয়ট’ (Patriot) ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হবে। এটি মূলত একটি শক্তিশালী ‘এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ (Air Defense System), যা ড্রোন বা ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এর আগে সৌদি আরবে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ (F-35) ‘স্টিলথ’ যুদ্ধবিমান সরবরাহের বিষয়েও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
ইরান ফ্যাক্টর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতা
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল অস্ত্র বিক্রির টাইমিং বা সময় নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের পর থেকেই দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে, পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতির ফলে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো আশঙ্কা করছে যে, ইরানের সাথে কোনো বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে তাদের স্থিতিশীল অর্থনীতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মূলত সেই সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করতেই নিজেদের ‘ডিফেন্স মেকানিজম’ (Defense Mechanism) জোরদার করছে রিয়াদ।
ফিলিস্তিন ইস্যু ও স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় ধীরগতি
দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বা ‘নরমালাইজেশন’ (Normalization) প্রক্রিয়া নিয়ে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছিল। তবে গাজা ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান সেই প্রক্রিয়াকে কার্যত থমকে দিয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্র সরবরাহ বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে চাইলেও ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের বরফ গলার সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত ক্ষীণ।
সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটনের এই ১৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা। এটি কেবল প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রয় নয়, বরং ইরানকে একটি কড়া ‘জিওপলিটিক্যাল’ (Geopolitical) বার্তা প্রদান হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।