ক্রীড়া ও রাজনীতির অহি-নকুল সম্পর্ক নতুন কিছু নয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা এখন এক চরম নাটকীয় মোড় নিয়েছে। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ দেখিয়ে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত কেবল ক্রিকেট মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর মতে, বাংলাদেশের এই অনড় অবস্থান ভারতের ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বপ্নে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ আউট, স্কটল্যান্ড ইন
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাটিতে বসতে যাচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসর। তবে এই আসরে দেখা যাবে না লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তাদের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করায় বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে শূন্যস্থানে ‘Replacement’ হিসেবে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করেছে আইসিসি।
রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আইপিএল বিতর্ক
এই সংকটের সূত্রপাত কেবল মাঠের লড়াই থেকে হয়নি। বিসিসিআই-এর বিশেষ নির্দেশনায় কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) তাদের স্কোয়াড থেকে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের ক্রিকেটীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর ওপর বাংলাদেশে এক হিন্দু ব্যক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছে, তার ছায়া পড়েছে ক্রিকেটের সবুজ গালিচায়। জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তানও এই বিশ্বকাপ বয়কটের ‘Potential Risk’ তৈরি করেছে, যার সিদ্ধান্ত আজই আসার কথা।
আইসিসির ওপর বিসিসিআই-এর প্রভাব ও ‘লবিং’
আইসিসি নিজেদের একটি স্বাধীন ‘Governance’ বা শাসনব্যবস্থার দাবি করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিসিবির অভিযোগ, আইসিসি মূলত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে। আইসিসির বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুত্র, যা সরাসরি রাজনৈতিক সংযোগের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া আইসিসির ব্রডকাস্টিং স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ভারতীয় করপোরেট শক্তির ঘনিষ্ঠতা বিসিসিআই-এর ‘Lobbying’ ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
অলিম্পিক বিড ও আইওসি-র ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
ভারতের জন্য এই বিতর্কটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এল। ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমসের স্বত্ব পাওয়ার পর ভারত এখন আহমেদাবাদে ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের জন্য ‘Host City Bid’ দিচ্ছে। এখানে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কাতার। তবে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (IOC) নিয়ম অত্যন্ত কঠোর। অলিম্পিক চার্টার অনুযায়ী, ক্রীড়া সংস্থাকে সব ধরনের বহিরাগত ‘Political Interference’ বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকতে হবে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে একটি সূত্র জানিয়েছে, "যদি কোনো আয়োজক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশগুলোর বয়কটের আশঙ্কা থাকে, তবে আইওসি সেই দেশকে গেমস আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়ার ঝুঁকি নেবে না।" আইওসির এই ‘Zero Tolerance’ নীতির উদাহরণ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জাকার্তায় আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ইসরায়েলি দলকে ভিসা না দেওয়ায় ইন্দোনেশিয়াকে অলিম্পিক আয়োজনের দৌড় থেকে ছিটকে যেতে হয়েছে।
ক্রিকেট ও অলিম্পিকের ভবিষ্যৎ
২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে আইওসির মূল লক্ষ্য ছিল ভারতীয় বিশাল বাজারকে আকর্ষণ করা। কিন্তু খেলাধুলার রাজনীতিকরণ বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে বৈরিতার কারণে যদি টুর্নামেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়, তবে আইওসি ভারতের অলিম্পিক স্বপ্নকে পাশ কাটিয়ে যেতে দ্বিধা করবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি বিশ্বাসযোগ্য অলিম্পিক আয়োজক হতে হলে ভারতকে অবশ্যই তার প্রতিবেশী দেশগুলোর (বাংলাদেশ ও পাকিস্তান) সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। খেলার মাঠে রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ভারতের বৃহত্তম ক্রীড়া স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।