ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘এল ক্লাসিকো’ বলা হয় ভারত-পাকিস্তান লড়াইকে। মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এই দ্বৈরথ এখন বিশ্ব ক্রিকেটের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। তবে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের না খেলার ঘোষণায় কেবল ভক্তরাই হতাশ নন, বরং চরম উদ্বেগে পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC)। এই একটি ম্যাচ বাতিল হলে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কত বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বিজ্ঞাপনী বাজার ও আকাশচুম্বী চাহিদা
প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ (Bilateral Series) হয় না। ফলে আইসিসি বা এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (ACC) টুর্নামেন্টগুলোতে এই দুই দলের লড়াইয়ের জন্য মুখিয়ে থাকেন কোটি কোটি দর্শক। গত বছরের এশিয়া কাপের পরিসংখ্যান বলছে, ভারত-পাক ম্যাচে মাত্র ১০ সেকেন্ডের একটি ‘অ্যাড স্পট’ (Ad Spot) বা বিজ্ঞাপনের জন্য স্পন্সরদের গুনতে হয়েছে ১৪ থেকে ১৬ লাখ রুপি।
মূলত এই বিশাল ‘মার্কেট ভ্যালু’ (Market Value) মাথায় রেখেই আইসিসি প্রতিটি বড় ইভেন্টে ভারত ও পাকিস্তানকে একই গ্রুপে রাখার বাণিজ্যিক কৌশল অবলম্বন করে। আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সেই বাণিজ্যিক মডেলে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কত টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে আইসিসি?
ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ক্রিকবাজ’-এর তথ্যমতে, প্রায় দেড়শ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতের প্রতিটি ম্যাচের একটি বিশাল অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। আইসিসির কাছে টিম ইন্ডিয়ার প্রতিটি ম্যাচের গড় আর্থিক মূল্য প্রায় ১০ থেকে ১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় ১০০ কোটি রুপির কাছাকাছি।
তবে ম্যাচটি যদি পাকিস্তানের বিপক্ষে হয়, তবে তার ‘হাইপ’ এবং দর্শক চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ব্রডকাস্ট রেভিনিউ (Broadcast Revenue) এবং স্পন্সরশিপ ভ্যালু অন্য যেকোনো সাধারণ ম্যাচের তুলনায় দ্বিগুণ। সে হিসেবে পাকিস্তান যদি ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচটি বয়কট করে, তবে আইসিসি সরাসরি প্রায় ২০ থেকে ২২ মিলিয়ন ডলারের রাজস্ব হারাতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি টাকারও বেশি।
পয়েন্ট টেবিল ও নেট রানরেটের সমীকরণ
ম্যাচ বয়কট করলে পাকিস্তান কেবল আর্থিকভাবে নয়, কৌশলগতভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল নির্ধারিত ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানালে প্রতিপক্ষ দল (এক্ষেত্রে ভারত) সরাসরি ২ পয়েন্ট পেয়ে যাবে। আইসিসির ১৬.১০.৭ ধারা অনুযায়ী, ম্যাচ না খেলার প্রভাব পড়বে পাকিস্তানের নেট রানরেটের (Net Run Rate) ওপর। তবে ভারত না খেলেও পূর্ণ পয়েন্ট পাবে এবং তাদের রানরেটে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
পিসিবিকে আইসিসির কড়া হুঁশিয়ারি
পাকিস্তানের এই ‘বয়কট’ সংস্কৃতি ক্রিকেটের বিশ্বজনীন ইমেজের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছে আইসিসি। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংস্থাটি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে (PCB) সতর্ক করে জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক ক্রিকেট ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক নয়। বিবৃতিতে বলা হয়, “পিসিবি নিজেই এই ক্রিকেট কাঠামোর একজন প্রধান অংশীদার এবং সুবিধাভোগী। এই সিদ্ধান্তের ফলে পাকিস্তানের লাখ লাখ ভক্ত যেমন বঞ্চিত হবে, তেমনি দেশটির ক্রিকেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, আইসিসি এখন পাকিস্তানের ওপর বড় ধরনের আর্থিক জরিমানা বা ভবিষ্যতে কোনো ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ কেড়ে নেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপের কথা ভাবছে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটীয় কূটনীতি এই অচলাবস্থা নিরসন করতে পারে কি না।