সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে হারিয়ে দাপুটে জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। পোখারা রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে সোমবার ২-০ গোলের এই জয়টি কেবল পয়েন্ট তালিকার উন্নতি নয়, বরং লাল-সবুজের কিশোরীদের লড়াকু মানসিকতার জয় হিসেবে দেখছেন কোচ পিটার জেমস বাটলার। শুরুতে ভারতের আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে কিছুটা নড়বড়ে মনে হলেও সময়ের সাথে সাথে ‘খোলস’ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন অর্পিতা-আলপিরা, যা দেখে ম্যাচ শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন ইংলিশ এই মাস্টারমাইন্ড।
শুরুতে চাপ, পরে দাপট: যেভাবে ভারতকে স্তব্ধ করল বাংলাদেশ
ম্যাচের প্রথমার্ধে ভারতের মেয়েরা একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত করে তুলেছিল। কিন্তু ২৯তম মিনিটে দৃশ্যপট বদলে যায়। অর্পিতা বিশ্বাসের দারুণ এক লক্ষ্যভেদে লিড নেয় বাংলাদেশ। ১-০ তে এগিয়ে যাওয়ার পর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় নারী দলের। এরপর আলপি আক্তারের ব্যবধান বাড়ানো গোলটি ভারতকে ম্যাচ থেকে কার্যত ছিটকে দেয়। ২-০ গোলের এই জয় বাংলাদেশকে টুর্নামেন্টে শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে।
‘শারীরিক সক্ষমতা নয়, মানসিকভাবে জিতেছে আমার মেয়েরা’
ম্যাচ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় কোচ পিটার জেমস বাটলার তাঁর দলের ‘Mental Toughness’ বা মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসা করেন। বাটলার বলেন, “মেয়েরা অসাধারণ মানসিকতা দেখিয়েছে। আমাদের শুরুটা ভালো ছিল না, খেলোয়াড়দের ছোটখাটো চোট (Injury) এবং ক্লান্তি ছিল। কিন্তু প্রথম দিকের সেই ‘হালকা ঝড়’ বা চাপ আমরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।”
প্রতিপক্ষ ভারত সম্পর্কে বাটলারের পর্যবেক্ষণ ছিল বেশ বাস্তববাদী। তিনি স্বীকার করেন, “ভারতের কিছু ‘High-quality’ খেলোয়াড় আছে। তারা আমাদের চেয়ে লম্বা এবং শারীরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী (Physically Stronger)। আমাদের মেয়েরা তুলনামূলক ছোটখাটো গড়নের। তবে আমরা আজ মানসিক শক্তিতে তাদের ছাড়িয়ে গিয়েছি এবং প্রাপ্য জয়টি ছিনিয়ে এনেছি।”
আঘাত সামলে জয়: কোচের ‘ট্যাকটিক্যাল’ সিদ্ধান্ত ও পরিবর্তন
ম্যাচের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত খেলোয়াড়দের তুলে নেওয়া নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকলেও বাটলার বিষয়টিকে ‘Injury Management’ হিসেবে দেখিয়েছেন। প্রথমার্ধের শেষদিকে মামনি চাকমা ও ক্রানুচিং মারমাকে তুলে নিয়ে তিনি প্রতিমা মুন্দা ও শান্তি মার্দিকে মাঠে নামান। দ্বিতীয়ার্ধে সুরভি আকন্দ প্রীতি এবং তৃষ্ণা রানীদের পরিবর্তে নামানো হয় ফ্রেশ লেগ।
বাটলার পরিষ্কার করে বলেন, “আমি ইচ্ছা করে স্ট্রাইকারদের সরাইনি। সুরভি ও তৃষ্ণার চোট ছিল। ক্রানুচিংয়ের ঘাড়ে ব্যথা ছিল। এছাড়া রাইট ব্যাক (Right Back) পজিশনে মামনি ঠিকঠাক কাজ করতে পারছিল না। আমার সিস্টেমে কাউকে খেলতে হলে রক্ষণ ও আক্রমণ—উভয় দিকেই সমান পারদর্শী হতে হবে। গত দুই বছর ধরে আমি এই ‘Tactical Discipline’-এর ওপর জোর দিয়েছি।”
সাফল্যের ধারা বজায় রাখার প্রত্যয়
ভারতের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল আবারও প্রমাণ করল যে, দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে তারা অন্যতম পরাশক্তি। কোচের সুপরিকল্পিত পরিবর্তন এবং খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে এই জয়টি টুর্নামেন্টের পরবর্তী ম্যাচগুলোর জন্য বড় টনিক হিসেবে কাজ করবে। পিচ বা কন্ডিশনের চেয়েও যে লক্ষ্য অর্জনের ক্ষুধা বেশি জরুরি, তা আজ পোখারা স্টেডিয়ামে আলপি-অর্পিতারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।