গাজা উপত্যকায় চলমান ভয়াবহ মানবিক সংকটের মাঝে জীবনদায়ী ত্রাণ সহায়তা পাঠাতে বাধা প্রদান এবং সহিংসতায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে ফ্রান্স। দুই ফরাসি-ইসরাইলি নারীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে ফরাসি বিচারবিভাগ। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লে মন্ডে’-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়। তদন্তকারীদের মতে, অভিযুক্তরা গাজায় চলমান ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
তদন্তের নিশানায় দুই দ্বৈত নাগরিক
গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া দুই নারী ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করলেও বর্তমানে ইসরাইলে বসবাস করছেন এবং তারা ‘ডুয়েল সিটিজেনশিপ’ বা দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী। অভিযুক্তদের মধ্যে একজন হলেন নিলি কুপফার-নাউরি, যিনি ‘ইসরাইল ইজ ফরএভার’ (Israel Is Forever) নামক উগ্রপন্থী সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যজন হলেন র্যাচেল টুইটু, যিনি ত্রাণবাহী ট্রাক আটকে দেওয়ার জন্য কুখ্যাত সংগঠন ‘সাভ ৯’ (Tsav 9)-এর একজন সক্রিয় কর্মী। ফরাসি-ফিলিস্তিনি নাগরিক এবং একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের দীর্ঘ আইনি লড়াই ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ এই পরোয়ানা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে।
‘সাভ ৯’ এবং চরমপন্থী কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে
গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে ‘সাভ ৯’ নামক একটি কট্টরপন্থী ইসরাইলি গোষ্ঠী। ২০২৪ সালের জুন মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই সংগঠনটিকে একটি ‘ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ’ বা সহিংস চরমপন্থী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। অভিযোগ রয়েছে, এই গোষ্ঠীর সদস্যরা জর্ডান থেকে আসা ত্রাণের রুটগুলোতে নিয়মিত টার্গেট করে হামলা চালায়। তারা গাজাগামী ট্রাকগুলোতে লুটপাট চালানো, খাদ্যসামগ্রী রাস্তায় ফেলে নষ্ট করা এবং চালকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো অপরাধে জড়িত।
বিশেষ করে ১৩ মে, ২০২৪ তারিখে পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের কাছে গাজার ক্ষুধার্ত সাধারণ মানুষের জন্য পাঠানো দুটি বিশাল ত্রাণবাহী ট্রাকে লুটতরাজ চালিয়ে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে র্যাচেল টুইটু ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
আন্তর্জাতিক চাপ ও বিচারিক গুরুত্ব
গাজা যখন দুর্ভিক্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তখন জীবনদায়ী রসদ ও ওষুধের বহরে এ ধরনের পরিকল্পিত বাধা সৃষ্টিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে ফ্রান্সের আদালত। মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, গাজার বেসামরিক নাগরিকদের না খাইয়ে মারার যে নীতি কট্টরপন্থীরা গ্রহণ করেছে, তাতে এই দুই নারীর প্রত্যক্ষ প্ররোচনা রয়েছে। ফরাসি আইন অনুযায়ী, কোনো ফরাসি নাগরিক বিদেশে অবস্থান করে এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হলে তার বিরুদ্ধে নিজ দেশে বিচার প্রক্রিয়া চালানোর বিধান রয়েছে।
এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির ফলে অভিযুক্তরা এখন ইন্টারপোল বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের পুলিশের নজরদারিতে থাকবেন। ফরাসি কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপটি ইউরোপের অন্যান্য দেশের জন্য একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে যে, যুদ্ধের আড়ালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা এবং ত্রাণ সরবরাহে বাধা দেওয়াকে আর হালকাভাবে দেখা হবে না।
মানবিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি
ইসরাইলের কঠোর অবরোধের ফলে গাজায় এখন চরম ‘হিউম্যানিটেরিয়ান ক্রাইসিস’ বা মানবিক বিপর্যয় বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করছে যে, ত্রাণ বহর বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে শিশু ও নারীরা অনাহারে মৃত্যুবরণ করছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে ‘সাভ ৯’-এর মতো গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড কেবল স্থানীয় নয়, বরং বৈশ্বিক মানবাধিকারের প্রতি এক চরম অবজ্ঞা। ফ্রান্সের এই গ্রেফতারি পরোয়ানা সেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।