মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে থাকা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা নিরসনে এবার সরাসরি মধ্যস্থতাকারীর সুর চড়ালো সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা কাটাতে ইরানকে অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর পরামর্শ দিয়েছে দেশটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হামলার হুমকির মুখে যখন তেহরান ও ওয়াশিংটন দুই পক্ষই নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসার ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঠিক তখনই আমিরাতের পক্ষ থেকে এই শক্তিশালী কূটনৈতিক বার্তা এল।
বিপর্যয় এড়াতে সরাসরি আলোচনার তাগিদ
দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট সামিট’ (World Government Summit)-এ সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আনোয়ার গার্গাশ তেহরানের প্রতি এই বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই অঞ্চল ইতিমধ্যে একাধিক বিপর্যয়কর ‘রিজিওনাল কনফ্লিক্ট’ (Regional Conflict) বা আঞ্চলিক সংঘাতের সাক্ষী হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কারো কাম্য নয়।
আনোয়ার গার্গাশ বলেন, “এখন ইরানের একটি চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করা উচিত। আমি সরাসরি ইরান-আমেরিকান আলোচনা দেখতে চাই, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে একটি গভীর বোঝাপড়া তৈরি হবে এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর অবসান ঘটবে।”
সুর নরম করছেন পেজেশকিয়ান: ‘ন্যায্য আলোচনার’ প্রস্তুতি
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির পাল্টা জবাব দিলেও কূটনীতির পথ খোলা রেখেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে দেশটির কূটনীতিকদের বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ‘সম্মান, প্রজ্ঞা ও বাস্তবতার’ ভিত্তিতে একটি ‘ফেয়ার অ্যান্ড ইকুয়াল নেগোসিয়েশন’ (Fair and Equal Negotiations) বা ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক আলোচনার উদ্যোগ নিতে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন।
পেজেশকিয়ান তার পোস্টে স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো প্রকার হুমকি বা অযৌক্তিক প্রত্যাশাহীন একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে ইরান আলোচনার টেবিলে ফিরতে প্রস্তুত। তার এই নমনীয় অবস্থানকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একটি ‘ডিল’ বা চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রাথমিক সংকেত হিসেবে দেখছেন।
আঞ্চলিক মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক তৎপরতা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনে কেবল নিজেরা নয়, বরং আঞ্চলিক মিত্রদের সহযোগিতাও নিতে চাইছে ইরান। সোমবার তেহরান জানিয়েছে, কাতার, তুরস্ক, মিশর ও ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রস্তাবিত ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইনিশিয়েটিভ’ (Diplomatic Initiative) বা কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আলোচনার একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো বা ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ চূড়ান্ত হতে পারে।
কেন এই পরমাণু চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ?
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ এবং ট্রাম্পের পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ (Nuclear Deal) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এই সংকটকে ঘনীভূত করেছে। বর্তমানে ইসরাইল-গাজা ও লেবানন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাত শুরু হলে তা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্ভবত এই ‘গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট’ বা বৈশ্বিক প্রভাব বিবেচনা করেই তেহরানকে চুক্তির পথে হাঁটার পরামর্শ দিচ্ছে।
একদিকে ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপের কৌশল, অন্যদিকে পেজেশকিয়ানের ‘ব্যালেন্সড ফরেন পলিসি’ বা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আরব আমিরাতের এই আহ্বান মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।