প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে মানুষের হার না মানা মানসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করল ১৩ বছরের এক কিশোর। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আর প্রবল বাতাসের ঝাপটা উপেক্ষা করে টানা ৪ ঘণ্টা সাঁতরে মৃত্যুর মুখ থেকে নিজের মা এবং ছোট দুই ভাই-বোনকে ফিরিয়ে এনেছে সে। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলে ঘটে যাওয়া এই অবিশ্বাস্য ঘটনাকে খোদ উদ্ধারকারীরা ‘অলৌকিক’ এবং ‘অসম্ভব এক সাহসিকতা’ বলে অভিহিত করেছেন।
ছুটির আনন্দ যখন বিভীষিকা
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ (ABC News) জানায়, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় পার্থ থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে কুইন্ডালুপ (Quindalup) উপকূলে ছুটি কাটাতে গিয়েছিল পরিবারটি। ৪৭ বছর বয়সী এক নারী তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে একটি Inflatable Paddleboard এবং একটি কায়াক (Kayak) নিয়ে সাগরে নামেন। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রবল বাতাস ও স্রোতের টানে উপকূল থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন তাঁরা। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দঘন মুহূর্তটি এক বিভীষিকায় পরিণত হয়।
কিশোরের একক লড়াই ও কঠিন সিদ্ধান্ত
বিপদ টের পেয়ে ১৩ বছর বয়সী ওই কিশোর প্রথমে কায়াক নিয়ে তীরে ফেরার চেষ্টা করে। কিন্তু সমুদ্র এতটাই উত্তাল ছিল যে, কায়াকের ভেতরে পানি ঢুকে সেটি প্রায় ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়। পরিবারের অন্য সদস্যরা একটি প্যাডেলবোর্ড আঁকড়ে ধরে মাঝসমুদ্রে অসহায় অবস্থায় ভাসতে থাকেন। মা ও ভাই-বোনকে বাঁচাতে তখন কিশোরটি সাগরের নোনা পানিতে ঝাঁপ দেয়।
ন্যাচারালিস্ট মেরিন রেসকিউয়ের (Naturaliste Marine Rescue) কমান্ডার পল ব্রেসল্যান্ড জানান, ছেলেটি প্রথমে দুই ঘণ্টা লাইফ জ্যাকেট (Life Jacket) পরে সাঁতার কাটে। কিন্তু এক পর্যায়ে সে বুঝতে পারে, লাইফ জ্যাকেটের কারণে সে দ্রুত এগোতে পারছে না এবং ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। তখন সে এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেয়; গায়ের লাইফ জ্যাকেটটি খুলে ফেলে পরবর্তী দুই ঘণ্টা জীবন বাজি রেখে সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
রূদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান
তীরে পৌঁছেই কিশোরটি দ্রুত কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে। সে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তাদের কায়াক ও প্যাডেলবোর্ডের রঙ এবং সম্ভাব্য অবস্থান বর্ণনা করে, যা উদ্ধার অভিযানে অত্যন্ত সহায়ক হয়। উপকূলীয় পুলিশ ও ভলান্টিয়ার মেরিন রেসকিউ দল দ্রুত সাগরে তল্লাশি শুরু করে। রাত সাড় আটটার দিকে উপকূল থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে মাঝসমুদ্রে মা ও বাকি দুই শিশুকে পাওয়া যায়।
সাউথ ওয়েস্ট পুলিশের ইন্সপেক্টর জেমস ব্রাডলি বলেন, “ভাগ্যক্রমে মা ও ছোট দুই ভাই-বোন লাইফ জ্যাকেট পরে ছিলেন, যা তাদের ভেসে থাকতে সাহায্য করেছে। তবে ১৩ বছরের ওই ছেলেটির মানসিক দৃঢ়তা ও অদম্য সাহস না থাকলে আজ আমরা একটি বড় ট্র্যাজেডির সাক্ষী হতাম। তার প্রশংসা করার ভাষা আমাদের নেই।”
সুস্থতার পথে লড়াকু পরিবার
উদ্ধারের পর ৪৭ বছর বয়সী নারী এবং তাঁর ১২ ও ৮ বছর বয়সী দুই সন্তানকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন সেন্ট জন ডব্লিউএ (St John WA) প্যারামেডিকরা। পরে তাঁদের বাসেলটন হেলথ ক্যাম্পাসে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তাঁরা আশঙ্কামুক্ত এবং সুস্থ আছেন।
সমুদ্রের বিশালতার কাছে ১৩ বছরের একটি ছোট ছেলের এই বীরত্বগাথা এখন অস্ট্রেলিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বে আলোচনায়। প্রতিকূলতার মুখে ভেঙে না পড়ে কীভাবে ধীরস্থিরভাবে প্রিয়জনদের রক্ষা করতে হয়, এই কিশোর যেন তারই এক জীবন্ত পাঠ দিয়ে গেল।