গাজায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তির আশায় যে যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) কার্যকর হয়েছিল, তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফের রক্তাক্ত তাণ্ডব শুরু করেছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। গত ২৪ ঘণ্টায় গাজা উপত্যকাজুড়ে চালানো ইসরাইলি বিমান ও স্থল হামলায় অন্তত ১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। বিশেষ করে গাজা শহরের তুফাহ ও জেইতুন এলাকায় চালানো নারকীয় হামলায় ১১ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে হাসপাতাল সূত্র। কেবল গাজা নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেরিকোতেও ইসরাইলি অভিযানে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
মৃতের মিছিল ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন
গত বছরের অক্টোবর থেকে কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মাঠপর্যায়ে ইসরাইল তার আগ্রাসন থামায়নি। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত গাজার আবাসিক এলাকাগুলোতে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়। আন্তর্জাতিক আইন (International Law) ও মানবিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে চালানো এই হামলায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে আটকা পড়ে আছেন বলে স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলো জানিয়েছে।
রাফাহ সীমান্তে অনিশ্চয়তার দোলাচল
এদিকে দীর্ঘ ১৮ মাস অবরুদ্ধ থাকার পর মিসর ও গাজার মধ্যকার রাফাহ সীমান্ত (Rafah Crossing) পরীক্ষামূলকভাবে খুলে দেওয়া হলেও সাধারণ ফিলিস্তিনিদের যাতায়াতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রশাসন। প্রায় দেড় বছর পর মিসরে আটকে পড়া ফিলিস্তিনিদের প্রথম বাসটি গাজায় প্রবেশ করলে সেখানে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। তবে এই স্বস্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী।
নিরাপত্তা ছাড়পত্র বা ‘Security Clearance’-এর দোহাই দিয়ে সীমান্ত পারাপার অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত প্রায় ৫০ জনের গাজায় ঢোকার কথা থাকলেও মাত্র ১২ জন (৩ জন নারী ও ৯ জন শিশু) প্রবেশ করতে পেরেছেন। বাকিরা সীমান্তে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসায় বাধা ও মানবিক বিপর্যয়
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জরুরি চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়ার অপেক্ষায় থাকা মুমূর্ষু রোগীদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ৫০ জন রোগীর যাওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৫ জন মুমূর্ষু রোগী ও তাদের স্বজনদের মিসরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (PRCS) জানিয়েছে, বুধবারের জন্য রাফাহ ক্রসিং দিয়ে আহত ও অসুস্থদের বহির্গমন পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে বিনা চিকিৎসায় অনেক আহতের মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের হুঁশিয়ারি ও বিশ্ব প্রতিক্রিয়া
গাজার এই শোচনীয় অবস্থায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, “গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (Self-determination) রক্ষায় জাতিসংঘ অটল থাকবে।” গুতেরেস দ্রুত ও বৃহৎ পরিসরে ‘Humanitarian Aid’ বা মানবিক সহায়তা প্রবেশের ওপর জোর দেন এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর এই ধারাবাহিক হামলা কেবল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত ‘Crisis’ তৈরির চেষ্টা, যা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতাকে আরও উসকে দেবে।