দেশের বাজারে মূল্যবান ধাতু স্বর্ণের দামে চলছে চরম অস্থিরতা। দামের রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায় রীতিমতো দিশেহারা সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা। গত ১২ দিনের ব্যবধানে দেশের বাজারে ১৩ দফা সমন্বয় করা হয়েছে স্বর্ণের দাম, যা দেশের জুয়েলারি ইতিহাসে বিরল। এই উত্থান-পতনের ধারায় ৮ বার দাম বাড়ানো হলেও কমানো হয়েছে ৫ বার। সবশেষ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) এক ধাক্কায় ভরিতে ১০ হাজার ৯০৬ টাকা বাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে এই ধাতুর মূল্য।
বাজুসের নতুন দর ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বর্ণের এই নতুন দাম নির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, স্থানীয় বাজারে ‘তেজাবি স্বর্ণ’ (পিওর গোল্ড)-এর সরবরাহ সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের মান অনুযায়ী নতুন মূল্যতালিকা নিম্নরূপ:
২২ ক্যারেট: ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা (প্রতি ভরি)
২১ ক্যারেট: ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা (প্রতি ভরি)
১৮ ক্যারেট: ২ লাখ ১৪ হাজার ৪৪৩ টাকা (প্রতি ভরি)
সনাতন পদ্ধতি: ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৮৫ টাকা (প্রতি ভরি)
১২ দিনের রোলারকোস্টার রাইড স্বর্ণের এই মূল্যবৃদ্ধির গ্রাফটি বিশ্লেষণ করলে এক চরম বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যায়। গত ২৯ জানুয়ারি দেশে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখর ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকায় পৌঁছেছিল। ঠিক তার পরের দিন ৩০ জানুয়ারি এক ধাক্কায় দাম কমেছিল ১৪ হাজার ৬৩৮ টাকা। এরপর ২ ফেব্রুয়ারি একদিনেই দুই দফায় দাম কমানো হয়েছিল, যার ধারাবাহিকতায় মোট ১৩ হাজার ৯৩৯ টাকা কমেছিল মূল্যবান এই ধাতুর দর। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি; ৩ ফেব্রুয়ারি আবারও বড় লাফ দিয়ে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকার ঘর অতিক্রম করেছে স্বর্ণের বাজার।
২০২৬ সালের শুরু থেকেই অস্থিতিশীলতা পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৬ দিনে দেশে মোট ২৪ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে, আর কমানো হয়েছে ৮ বার। এই অস্থিরতা কেবল এই বছরেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে ২০২৫ সালেও দেশের বাজারে ৯৩ বার দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস, যার মধ্যে ৬৪ বারই ছিল মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা।
কেন এই অস্থিরতা? বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে ডলারের দামের ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে অনিশ্চয়তার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের ‘Market Value’ বাড়ছে। তবে বাংলাদেশে অস্থিরতার প্রধান কারণ হিসেবে স্থানীয় ‘তেজাবি স্বর্ণের’ বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং চোরাচালান বিরোধী কড়াকড়িকে চিহ্নিত করছেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ চেইন বা ‘Supply Chain’ ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় ডিলাররা বাড়তি দামে স্বর্ণ বিক্রি করছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ গ্রাহকের পকেটে।
বিয়ের মৌসুমে স্বর্ণের এই লাগামহীন দাম মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ঘন ঘন দাম পরিবর্তনের ফলে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের ‘Inventory Management’ বা মজুদ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।