ভোটগ্রহণের আগে BNP-তে বিদ্রোহের রেশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের আর মাত্র সপ্তাহখানেক বাকি। কিন্তু শেষ সময়ে এসেও ধানের শীষ প্রতীক না পেয়ে সারা দেশে ৬৫টির মতো আসনে বিএনপির 'অভিমানী' নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী (Independent Candidate) হিসেবে ভোটের মাঠে রয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে ৩৫-৪০টি আসনে ভোটের লড়াইয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন এই বিদ্রোহীরা, যার মধ্যে আবার ২০টির মতো আসনে ধানের শীষ প্রতীকের কিংবা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট প্রার্থীদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
বিদ্রোহের চিত্র: বহিষ্কার ও বিভক্তি
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও বিদ্রোহীরা মাঠে থাকায় বিএনপির তৃণমূল কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
সংখ্যার হিসাব: শুরুতে ১১৭ আসনে ১৯০ জনের মতো নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা এবং তারেক রহমানের উদ্যোগের ফলে অনেকে সরে দাঁড়ালেও, এখনো প্রায় ৬৫টি আসনে বিদ্রোহীরা রয়ে গেছেন।
সাংগঠনিক ব্যবস্থা: দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় অন্তত ৭১ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃত এসব নেতার মধ্যে বেশ কিছু সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন।
তৃণমূলের বিভক্তি: স্থানীয় পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীরা অনেকেই এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে দলের মনোনীত বা সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। পদধারী কেউ কেউ দলীয় বহিষ্কারের ভয়ে নীরবে তাদের সমর্থন দিচ্ছেন।
তারেক রহমানের কৌশল: তৃণমূল সফর ও সংহতি
বিদ্রোহী প্রার্থীদের 'নিষ্ক্রিয় করতে' দলের পক্ষ থেকে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এই তৎপরতার মূল কেন্দ্রে রয়েছেন তারেক রহমান।
সক্রিয় সমর্থন: তারেক রহমান বিভিন্ন জেলা সফরে ধানের শীষ ও জোট প্রার্থীদের একসঙ্গে মঞ্চে নিয়ে সমাবেশ করছেন এবং জনতার সামনে তাদের নিজেই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।
ফল: এর মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট আসনে দলের বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা 'প্রান্তিক' তথা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন বলে দলের তৃণমূল বিদ্রোহী প্রার্থী থেকে ক্রমেই ধানের শীষের দিকে ঝুঁকছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, "যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করছে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।"
শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসন: BNP বনাম Rebel
বেশ কয়েকটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহীরা দলীয় প্রার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছেন:
নাটোর-১: বিএনপির প্রার্থী ফারজানা শারমিন পুতুলের বিপরীতে তাইফুল ইসলাম টিপু (সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক) স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী।
টাঙ্গাইল-৫: বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর বিপরীতে ফরহাদ ইকবাল (জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক) স্বতন্ত্র প্রার্থী।
ঢাকা-১২: গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের বিপরীতে সাইফুল আলম নীরব (সাবেক আহ্বায়ক, মহানগর উত্তর) স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
পটুয়াখালী-৩: গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের বিপরীতে হাসান মামুন (কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য) ঘোড়া প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২: জমিয়তের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবিবের বিপরীতে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে গণজোয়ার তৈরি করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত: Grassroots ভিক্তিই মুখ্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ বলেন:
গ্রহণযোগ্যতা: "দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনে যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, নিজ নিজ এলাকায় নিশ্চয় তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও শক্ত ভিত্তি রয়েছে।"
ভিত্তি: তিনি মনে করেন, শরিকদের অনেকের সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মতো গণভিত্তি নেই। স্থানীয় নেতারা দুর্দিনে কর্মীদের পাশে ছিলেন, ফলে তাদের একটি গুরুত্ব থাকবেই।
তুলনা: তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে ৫৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, "অনেক জায়গাই বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী ধানের শীষ বা জোট প্রার্থীর জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।"