বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প (RMG Sector) এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈশ্বিক বাজারে রফতানির টানা নেতিবাচক প্রবণতা, অন্যদিকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির কারণে স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে উৎপাদন ব্যবস্থা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আগামী মাসগুলোতে শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিল্প মালিকরা।
ছুটির জালে বন্দি উৎপাদন ও রফতানি ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, আগামী ৬০ দিনের ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালে দেখা যায়, নির্বাচন, রোজা এবং ঈদ মিলিয়ে অন্তত ২৫ দিন কারখানা বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ দুই মাসে উৎপাদন সচল থাকবে মাত্র ৩৫ দিন। বিজিএমইএ-র (BGMEA) পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনী জানিয়েছেন, বার্ষিক ছুটির তালিকায় নির্বাচনের জন্য কোনো নির্ধারিত ছুটি না থাকলেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কারখানা বন্ধ রাখা ছাড়া বিকল্প নেই। এই দীর্ঘ ছুটির প্রভাবে ‘শিপমেন্ট’ (Shipment) এবং বিদেশি ক্রেতাদের ‘পেমেন্ট’ শিডিউল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারের চ্যালেঞ্জ ও ‘ট্রাম্প ফ্যাক্টর’ চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা (Geopolitical Tension) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর শুল্কনীতির (Trump’s Tariff Policy) প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা চাপের মুখে পড়েছে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাও বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের আস্থায় চিড় ধরিয়েছে, যার ফলস্বরূপ টানা ছয় মাস ধরে রফতানি প্রবৃদ্ধিতে ধস নেমেছে।
দ্বিগুণ মজুরির চাপ ও তারল্য সংকট পোশাক শিল্পের জন্য মার্চ মাসটি হতে যাচ্ছে অগ্নিপরীক্ষার মতো। কারখানা মাত্র ৩৫ দিন খোলা থাকলেও মালিকদের পুরো মাসের বেতন পরিশোধ করতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ঈদের বোনাস এবং অনেক ক্ষেত্রে অগ্রিম বেতন। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, “ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়কালটি আমাদের জন্য চরম চ্যালেঞ্জিং। রফতানি মন্দার এই সময়ে এক মাসের খরচে প্রায় দ্বিগুণ মজুরি পরিশোধ করা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকারের পক্ষ থেকে নীতি সহায়তা (Policy Support) না পেলে এই নেতিবাচক ধারা কাটিয়ে ওঠা কঠিন।”
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ: স্বল্পমেয়াদী ত্রাণ বনাম দীর্ঘমেয়াদী সক্ষমতা এই সংকটময় মুহূর্তে বিজিএমইএ ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে স্বল্প সুদে ঋণ এবং রফতানি প্রণোদনার (Export Incentive) বকেয়া অর্থ দ্রুত ছাড়ের দাবি জানিয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা কেবল ভর্তুকি বা ঋণের ওপর নির্ভরতাকে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে দেখছেন না।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (RAPID)-এর চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সরকার সাময়িক স্বস্তির জন্য ভর্তুকি দিতে পারে, কিন্তু শিল্পকে টেকসই করতে হলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) কমপ্লায়েন্ট সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আগে সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা ও ভবিষ্যৎ শিল্প মালিকদের শঙ্কা, বেতন-বোনাস পরিশোধে সামান্য দেরি হলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে, যা রফতানি খাতকে আরও নাজুক করে তুলবে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর তারল্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণাই এখন তৈরি পোশাক খাতের টিকে থাকার শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।