বাংলাদেশের লোকসংগীত জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রখ্যাত বাউল শিল্পী ও সুরকার সুনীল কর্মকার আর নেই। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড় ৪টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (Legacy of a Baul Legend)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র এবং দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী রেখে গেছেন।
সুনীল কর্মকারের প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মরমী সাধক ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর ঘরানার এই শিল্পীর বিদায়কে লোকসংগীতের একটি অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন সংস্কৃতি কর্মীরা।
সুরলোকের ধ্রুবতারার মহাপ্রয়াণ
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন সুনীল কর্মকার। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও শুক্রবার ভোরে তার জীবনাবসান ঘটে। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার এই গুণী মানুষের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ও জন্মভূমিতে শোকাতুর পরিবেশ তৈরি হয়।
জালাল খাঁর আদর্শ ও সংগীত সাধনা
সুনীল কর্মকার কেবল একজন গায়কই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন লোকজ দর্শনের একজন নিবেদিতপ্রাণ সাধক। প্রখ্যাত বাউল সাধক ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর গানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তার দীর্ঘ সংগীত জীবন অতিবাহিত করেছেন। জালাল খাঁর অসংখ্য কালজয়ী গানে তিনি নতুন করে সুরারোপ করেছেন, যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে লোকসংগীতকে নতুন আঙ্গিকে পরিচিত করে তুলেছিল। তার আবেগময় কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতারা বারবার বিমোহিত হয়েছেন।
কণ্ঠ ও যন্ত্রের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী মিতালি
সুনীল কর্মকার ছিলেন একাধারে একজন ‘Multitalented’ শিল্পী। কেবল কণ্ঠের কারুকার্যেই নয়, বাদ্যযন্ত্র বাজানোতেও তার দক্ষতা ছিল ঈর্ষণীয়। বেহালা, দোতারা, তবলা এবং হারমোনিয়াম— প্রতিটি যন্ত্রেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। মঞ্চে যখন তিনি হাতে দোতারা বা বেহালা তুলে নিতেন, তখন এক অনন্য সম্মোহনী শক্তির সৃষ্টি হতো। তার এই বহুমুখী প্রতিভা তাকে সমসাময়িক অন্যান্য শিল্পীদের থেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
শৈশব থেকেই সুরের বাঁশি
১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার বান্দনাল গ্রামে এক সংগীতানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুনীল কর্মকার। শৈশব থেকেই সুরের প্রতি তার ছিল এক মজ্জাগত টান। মাত্র সাত বছর বয়সেই তিনি সংগীতের পথে পা বাড়ান। শৈশবের সেই শুরুটাই পরবর্তীকালে তাকে এক পূর্ণাঙ্গ সংগীত ব্যক্তিত্বে রূপান্তর করে। দীর্ঘ কয়েক দশকের ক্যারিয়ারে তিনি প্রায় দুই শতাধিক গান রচনা করেছেন, যা বাংলার লোকসংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও অবদান
সুনীল কর্মকারের মৃত্যুতে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হারাল। তিনি কেবল গতানুগতিক গান করেননি, বরং লোকসংগীতের মূল ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে তাতে আধুনিক অলংকরণ যুক্ত করেছেন। তার রচিত ও সুরারোপিত গানগুলো গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ এবং মরমী তত্ত্বের এক দারুণ প্রতিফলন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, তার সৃষ্ট এই বিশাল কর্মযজ্ঞ (Creative Portfolio) আগামী প্রজন্মের সংগীত শিক্ষার্থীদের কাছে গবেষণার বিষয় হয়ে থাকবে।
শুক্রবার বাদ জোহর বাউল সম্রাট জালাল খাঁর স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। প্রিয় শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে ভিড় করছেন গুণগ্রাহী ও সাধারণ মানুষ।