• বিনোদন
  • অন্ধকারের আলোকবর্তিকা: চিরতরে থেমে গেল বাউল সাধক সুনীল কর্মকারের সুরের একতারা

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা: চিরতরে থেমে গেল বাউল সাধক সুনীল কর্মকারের সুরের একতারা

বিনোদন ১ মিনিট পড়া
অন্ধকারের আলোকবর্তিকা: চিরতরে থেমে গেল বাউল সাধক সুনীল কর্মকারের সুরের একতারা

দৃষ্টিহীন এই গুণী শিল্পী ছিলেন জালাল খাঁর দর্শনের সার্থক ধারক; লোকসংগীতের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে সুরলোকে পাড়ি দিলেন তিনি।

বাউল ও লোকসংগীত জগতের এক কিংবদন্তি নক্ষত্র, প্রখ্যাত সুরসাধক সুনীল কর্মকার আর নেই। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ভোরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (End of an Era)। দীর্ঘ রোগভোগের পর প্রায় ৬৭ বছর বয়সে এই মরমী শিল্পীর প্রয়াণে বাংলার লোকজ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি কেবল একজন গায়কই ছিলেন না, বরং ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং বহুমুখী বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী এক ‘Iconic’ ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তাঁর জন্মস্থান নেত্রকোনার কেন্দুয়া এবং দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ময়মনসিংহে।

দৃষ্টিহীনতা যাকে রুদ্ধ করতে পারেনি

১৯৫৯ সালে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বান্দনাল গ্রামে জন্ম নেওয়া সুনীল কর্মকারের শৈশব ছিল অন্য সবার চেয়ে আলাদা। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু চোখের আলো না থাকলেও মনের গহীনে তিনি ধারণ করেছিলেন সুরের এক বিশাল আকাশ। অন্ধত্ব তাঁর সামনে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। শৈশব থেকেই তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন লোকসংগীতের কঠিন সাধনায়। তাঁর এই সংগ্রামী জীবন ছিল নিষ্ঠা ও একাগ্রতার এক মূর্ত প্রতীক।

জালাল খাঁর উত্তরসূরি ও যন্ত্রসংগীতের জাদুকর

মরমী কবি ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর আধ্যাত্মিক দর্শনে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন সুনীল কর্মকার। জালাল খাঁর গানের সুর ও বাণীকে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে আজীবন কাজ করেছেন। বাউল ধারার গানের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন প্রখর ‘Multi-instrumentalist’। বেহালা, দোতারা, তবলা ও হারমোনিয়ামের ওপর তাঁর ছিল অসাধারণ দখল। যখন তিনি দোতারা বা বেহালায় সুর তুলতেন, তখন সেই সুর যেন চারপাশের পরিবেশকে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় ডুবিয়ে দিত।

গীতিকার ও নেতৃত্বের অনন্য স্বাক্ষর

সুনীল কর্মকার কেবল অন্যের গানে কণ্ঠ দেননি, তিনি নিজেই ছিলেন একজন সৃজনশীল রচয়িতা। তাঁর হাত ধরে সৃষ্টি হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক লোকগান ও বাউল গীতি। লোকজ মেলা থেকে শুরু করে বড় বড় সাংস্কৃতিক আসরে তাঁর উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য। সংগীতের পাশাপাশি তিনি সাংগঠনিকভাবেও ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। ময়মনসিংহের লোকসংস্কৃতিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে (Global Context) তুলে ধরতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

নির্মোহ এক জীবনদর্শন

সুনীল কর্মকারের জীবন ছিল এক ‘Minimalist’ বা নির্মোহ মানুষের আদর্শ চিত্র। তাঁর ভক্ত ও অনুরাগী মহলে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন নিরহংকার ও আধ্যাত্মিক মানুষ হিসেবে। তাঁর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করে কবি ও সংগঠক শামীম আশরাফ বলেন, “সুনীল কর্মকার ছিলেন সংগ্রামের এক প্রতিচ্ছবি। আজীবন সুরকে ধারণ করে চলা এই মহান বাউল তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন।”

ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম বলেন, “সুনীল কর্মকার ছিলেন মাটির মানুষের শিল্পী। তাঁর মৃত্যুতে লোকসংগীতের যে ক্ষতি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।”

শেষ বিদায় ও উত্তরাধিকার

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ দিন ধরে তিনি কিডনি জটিলতা এবং শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ৩ ফেব্রুয়ারি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। শুক্রবার বাদ জোহর তাঁর জানাজা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

যিনি গাইতেন— ‘থাকতে ক্ষুধা, প্রেমও সুধা, পান করোরে পাগল মন’, সেই সুরের জাদুকর আজ মাটির বিছানায় শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকলেও, তাঁর গান আর সুরের ‘Legacy’ রয়ে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

Tags: music industry mymensingh news cultural icon netrokona news sunil karmakar jalal khan baul singer folk music legendary artist obituary notice