পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি, মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলী আর রসনাবিলাসের বিশ্বজোড়া খ্যাতি উপেক্ষা করা যে কোনো পর্যটকের জন্যই কঠিন। আর সেই টানেই এবার ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে ঐতিহ্যের সুবাস নিতে হাজির হলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। সম্প্রতি স্ত্রী ডিয়ানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দিনভর ঘুরে বেড়ালেন পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক সব জনপদ। ঢাকাইয়া আতিথেয়তা আর প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অনন্য মিশেলে রীতিমতো মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন এই মার্কিন দম্পতি।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রাষ্ট্রদূতের এই বিশেষ সফরের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
লালবাগ কেল্লার পুনর্জন্ম ও মার্কিন সহায়তা
রাষ্ট্রদূতের সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল মুঘল স্থাপত্যের অনিন্দ্য নিদর্শন লালবাগ কেল্লা। বিশেষ করে কেল্লার অভ্যন্তরে অবস্থিত ‘হাম্মামখানা’ বা রাজকীয় স্নানাগারটি তিনি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে ঘুরে দেখেন। উল্লেখ্য, এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটির সংস্কার ও সংরক্ষণে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ্যাম্বাসেডরস ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশন’ (AFCP)।
পুনরুজ্জীবিত এই নিদর্শনের কারুকাজ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে ক্রিস্টেনসেন বলেন, “এখানে অত্যন্ত চমৎকার কাজ হয়েছে। কয়েক বছর আগে স্থাপনাটি যেমন জরাজীর্ণ ছিল, বর্তমান চিত্র তার চেয়ে একেবারেই আলাদা। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে এই ‘Restoration’ প্রকল্প একটি সফল উদাহরণ।”
ইতিহাসের পদরেখায় হোসেনী দালান ও গলিপথ
লালবাগ কেল্লা থেকে বেরিয়ে রাষ্ট্রদূত সস্ত্রীক পদার্পণ করেন সপ্তদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক হোসেনী দালানে। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে তিনি অবলোকন করেন ঢাকার প্রাচীন ধর্মীয় ও স্থাপত্য ইতিহাস। এরপর কোনো আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা বলয়ের তোয়াক্কা না করেই তিনি মিশে যান পুরান ঢাকার চিরচেনা ব্যস্ত গলিপথে। আধুনিক যান্ত্রিক শহরের ভেতরে এমন এক জীবন্ত জাদুঘর দেখে রাষ্ট্রদূত বেশ রোমাঞ্চিত বোধ করেন। সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা এবং অলিগলির প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের গল্প তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
সাংস্কৃতিক কূটনীতি ও ভিডিও বার্তা
সফরকালে এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় বাংলা ও ইংরেজিতে কুশল বিনিময় করেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেন, “শুভ দিন। হ্যালো, আমি ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। আজ আমি পুরান ঢাকায় এসেছি। ২০২১ সালে আমার পূর্বসূরি রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলার এই স্থানটিকে ‘Ambassadors Fund for Cultural Preservation’-এর জন্য মনোনীত করেছিলেন। আজ এর সুফল দেখে আমি আনন্দিত।”
তিনি আরও যোগ করেন, “পুরান ঢাকার মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তা (Hospitality) আমাকে অভিভূত করেছে। এখানকার প্রতিটি ইটের স্তরে যে ইতিহাস মিশে আছে, তা রক্ষা করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।”
ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা
পুরান ঢাকার সফর মানেই রাজকীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া। রাষ্ট্রদূত এবং তাঁর স্ত্রী ডিয়ান স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেন। বিরিয়ানি থেকে শুরু করে বাকরখানি—পুরান ঢাকার রসনাবিলাসের যে সুখ্যাতি, তা নিজ হাতে পরখ করে দেখেন তাঁরা।
কূটনৈতিক মহলের মতে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই সফর কেবল একটি সাধারণ ভ্রমণ নয়, বরং এটি দুই দেশের মধ্যে ‘Cultural Diplomacy’ বা সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে এবং পর্যটন খাতের ব্র্যান্ডিংয়ে (Branding) এমন সফর ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।