উভয় প্রার্থী জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে, ফলাফল নির্ধারণে নারী ভোটার এবং আওয়ামী লীগের সোয়া এক লাখ ভোট ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেই মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।
বুধবার (০৪ ফেব্রুয়ারি) দিনব্যাপী আসনটির বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে সাধারণ ভোটার, প্রার্থী এবং তাদের কর্মীদের সাথে আলোচনা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা একাট্টা হয়ে প্রচার-প্রচারণা চালালেও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের এক প্রকার নিষ্ক্রিয়তায় সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে, এই ক্ষোভের পাশাপাশি বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়ছেন।
একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত শার্শা উপজেলা।
আসনটিতে বরাবরই আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান ছিল। আগের ১২টি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নয়বার, বিএনপি দুবার এবং জামায়াতে ইসলামী একবার এই আসন থেকে জয়লাভ করে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের আমলে ভোটারবিহীন ও জালিয়াতির তিনটি নির্বাচনও তালিকায় রয়েছে। রয়েছে বিএনপি আমলের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেরও হিসেব।
এছাড়া, স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলের পাতানো দুই নির্বাচনও বাদ যায়নি হিসেব থেকে। তবে, পরিস্থিতি এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৫ আগস্টের ছাত্রগণঅভ্যুত্থানের তোড়ে ক্ষমতা ছেড়ে পালানো আওয়ামী লীগ আর এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। ছাত্রজনতার ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানোয় মানবতাবিরোধী অপরাধে দলটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
সীমান্তবর্তী এই আসনটিতে আওয়ামী লীগের ভোটার এক লাখ ২০ হাজারের মতো।
যা মোট ভোটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তারা যদি কেন্দ্রে যান তাহলে তাদের ভোট জয়-পরাজয়ে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সে হিসেবে বিএনপি-জামায়াত উভয় দলই আশাবাদী। এক্ষেত্রে, জামায়াত একটু এগিয়েই রয়েছে বলে দাবি স্থানীয় ভোটারদের। তারা আকিজ পরিবারের প্রভাবকে বিবেচনায় নিচ্ছেন। তার সাথে যুক্ত হয়েছে আদ্-দ্বীন গ্রুপ। তাদের সম্মিলিত সমর্থন মাওলানা আজিজুর রহমানের পক্ষে বলে ধারণা স্থানীয়দের।
তবে, বিএনপির নুরুজ্জামান লিটন এবং তৃণমূলের বিএনপি নেতাকর্মীরাও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তারা বলেছেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভোটকেন্দ্রে যেতে চান। বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। মানুষের ভোটাধিকারের জন্য রক্ত ঝরেছে নেতাকর্মীদের। আওয়ামী লীগের যারা পদধারী নন এবং যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই তারা যাতে নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন সে ব্যাপারে সহযোগিতা করা হবে।
‘এসব ভোট (আওয়ামী ভোট) কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষে যাওয়ার কথা না’ বলে মত দিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন।
নারী ভোট যশোর-১ আসনের ফলাফল নির্ধারণে অন্যতম নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে বলেও মনে করেন শার্শা উপজেলার মানুষ। তারা বলছেন, এবারের নির্বাচনে পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার বেশি। যাদের সাথে দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছে জামায়াতে ইসলামী। স্থানীয় নারী কর্মীদের পাশাপাশি বাইরের এলাকা থেকেও নারী কর্মীদের নিয়ে এসে আসনটিতে কাজ করেছে দলটি।
‘আখেরাতে সওয়াব’র পাশাপাশি আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার মধ্য দিয়ে নারীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে দলটি। এরসাথে নারী ভোট নিয়ে স্থানীয় জামায়াতের ‘বিশেষ পরিকল্পনা’র কথাও বলেছেন কেউ কেউ। ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে তারা মৃত ও প্রবাসী ভোটারদের ভোটগুলো দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাস্ট করানোর জন্য ছক কষে এগুচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এক্ষেত্রে তাদেরকে সহায়তা করবেন কেন্দ্র ও কেন্দ্রের বাইরে থাকা ভোট কর্মকর্তারা। জামায়াত মনোভাবাপন্নরাও ভোট কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। জামায়াতের এমন সদস্যও রয়েছেন যিনি নিজ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচন কমিশনে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
নারী ভোটারদের কথা মাথায় নিয়েই আশার কথা শুনিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন। তিনি বলেছেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি এদেশের নারীদের সহানুভূতি রয়েছে। তারেক রহমানের আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনায় নারীবান্ধব কর্মসূচি ইতিমধ্যে নারীদের মধ্যে পরিচিত ও জনপ্রিয় হচ্ছে।
সেই সাথে যুক্ত হয়েছে জামায়াত আমির ও দলটির শীর্ষ নেতাদের সাম্প্রতিক নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া। সবমিলিয়ে নারীদের মধ্য থেকে ভালো ভোট ধানের শীষের পক্ষে আসবে। বিভিন্ন ওয়ার্ডের উঠান বৈঠক ও সমাবেশগুলোতে নারীদের বিপুল উপস্থিতি দেখে এটি অনুমান করা যায়।’ সরেজমিনে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মাওলানা আজীজুর রহমানের পাশাপাশি তার দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনি ময়দান চষে বেড়াচ্ছেন। এই কাজে তারা নারী কর্মীদেরকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বাড়ি বাড়ি পাঠাচ্ছেন। সে তুলনায় বিএনপির মধ্যে এখনো ‘সমস্যা’ পরিপূর্ণভাবে মেটেনি বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
যশোর-১ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ১১ হাজার ৬৩৩। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৫৫ হাজার ৮০৭ এবং নারী ভোটার এক লাখ ৫৫ হাজার ৮২৩। হিজড়া ভোটার তিনজন। আসনটিতে সনাতন সম্প্রদায়ের ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। যার একটা বড় অংশ বেনাপোল পৌর এলাকায় বসবাস করেন।
আসনটিতে মোট কেন্দ্র ১০২। ভোটকক্ষ ৫৭৭। ভোটকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৫১টি ঝুঁকিপূর্ণ। এরমধ্যে বেনাপোল পৌরসভা এলাকায় ৩৩টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৫টি এবং ১১টি ইউনিয়নের ৬৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৬টি ঝূঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ প্রশাসন।
ভোটাররা জানিয়েছেন, বেনাপোল পৌরসভা বরাবরই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে মোট ভোট ৩২ হাজার ৪৫০। ধানের শীষের প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটনের বাড়ি পৌর এলাকায়। এই ভোটের একটি বড় অংশ ধানের শীষের পক্ষে যাচ্ছে বলে মত সাধারণ ভোটারদের।
এর বাইরে বাহাদুরপুর, বেনাপোল, লক্ষ্মণপুর, ডিহি এবং উলাশী ইউনিয়নে বিএনপির দলগত অবস্থান অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো। পাশাপাশি বাগআঁচড়া এবং পুটখালী ইউনিয়নেও বিএনপির অবস্থান বেশ শক্ত। তারমধ্যে বাগআঁচড়া ইউনিয়নে বাড়ি জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আজিজুর রহমানের। এই ইউনিয়নেরই সন্তান বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি মফিকুল হাসান তৃপ্তিরও।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলকভাবে গোগা, কায়বা, নিজামপুর এবং শার্শা ইউনিয়নে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
বাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং শার্শা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান সাগর বলেছেন, ‘তিনদিন আগে যে অবস্থান ছিল তা আজ একটা পজিটিভ অবস্থানে এসেছে বলে মনে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘নেতা-কর্মী এবং দলের মুরব্বিরা সবাই অ্যাকটিভ। তবে, এখন মনে হচ্ছে একটু দেরি হয়ে গেছে। আরো আগে এটি হলে নির্ভার থাকা যেত। এখন পরিশ্রম একটু বেশি করার প্রয়োজন হলেও আমি আল্লার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি এই কারণে যে আমরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করতে পারছি।’
একই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, বেনাপোল পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সহসভাপতি মো. শাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে নিজেদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব ছিল। তা প্রায় কেটে গেছে। তৃপ্তি ভাই নিজে মাঠে না নামলেও তার অনুসারীরা নির্বাচনি ময়দানে রয়েছেন।’
এদিকে, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিএনপির দুইজন শীর্ষস্থানীয় নেতা মফিকুল হাসান তৃপ্তি এবং উপজেলা সভাপতি হাসান জহিরের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন অভিযোগ করেন, ‘তাদেরকে (তৃপ্তি-জহির) ভোটের মাঠে দেখা যাচ্ছে না। হাসান জহির দু-একটি সমাবেশে উপস্থিত থাকলেও মফিকুল হাসান তৃপ্তি শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে এড়িয়ে চলছেন।’
এসব বিক্ষুব্ধরা প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘নিজেরা প্রার্থী হলে তখন তারা কী করতেন? তখনও কি অসুস্থ বলে বাড়ি বসে থাকতেন?’
আরো একটি এগিয়ে বেশ কয়েকজন কর্মী বলেন, ‘বাগআঁচড়া, কায়বা, গোগা, পুটখালী এবং শার্শা ইউনিয়নে মফিকুল হাসান তৃপ্তির বিশাল জনপ্রিয়তা রয়েছে। নির্বাচন হয়ে গেলে এসব ইউনিয়নের ভোটের হিসেব তাকে দিতে হবে।’
সর্বশেষ শুক্রবার শার্শায় ধানের শীষের একটি নির্বাচনি সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন মফিকুল হাসান তৃপ্তি।