রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার অপরিহার্য
জেএসডি'র সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, দেশের রাষ্ট্র কাঠামোতে আজও ঔপনিবেশিক এবং বৈষম্যমূলক ধারা বিদ্যমান রয়েছে। তিনি অংশীদারিত্বমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উপর জোর দেন, যেখানে শ্রমজীবী, নারী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও সাধারণ মানুষ কেবল ভোটার নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্রিয় অংশীদার হবেন। তাঁর মতে, এই ইশতেহার কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের পাথেয়। '৭১ ও '২৪-এর শহীদদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এই ১০ দফার প্রস্তাব বাস্তবায়ন জরুরি।
জেএসডি'র ১০ দফার মূল প্রস্তাবনা
জেএসডি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মূলত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছে, যা দেশের শাসন ও কাঠামোর ব্যাপক সংস্কারের লক্ষ্য রাখে:
- দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ: নিম্নকক্ষে থাকবে ৩০০ নির্বাচিত সদস্য এবং উচ্চকক্ষে থাকবে ২০০ সদস্য, যারা শ্রমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবী, নারী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা থেকে আসবেন এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত হবেন। এর পাশাপাশি ৯টি প্রদেশ ও প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হবে।
- জাতীয় ঐকমত্যের সরকার: প্রধানমন্ত্রী হবেন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকে এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী হবেন নিকটতম সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকে।
- প্রার্থী প্রত্যাহার (Recall) ও জনগণের আইন উদ্যোগ: ১৫% ভোটারের লিখিত আবেদনের মাধ্যমে নতুন আইন প্রণয়নের সুযোগ থাকবে।
- নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার: রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত নির্দলীয় বা অদলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবেন।
- স্বাধীন নির্বাচন কমিশন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে, যা ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে।
- ফেডারেল সরকার ও স্বশাসিত উপজেলা: মেট্রোপলিটন সরকার, নয়টি প্রদেশ, নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার এবং স্থানীয় স্বশাসিত প্রশাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন।
- জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল (NEC): শ্রম, কর্ম ও পেশার প্রতিনিধির মাধ্যমে বাজেট ও নীতি প্রণয়নের সুপারিশ করবে।
- জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল (NSC): রাষ্ট্রপতির অধীনে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সেনা-বিমান-নৌ প্রধানের সমন্বয়ে গঠিত হবে।
- সাংবিধানিক আদালত: ৭ সদস্যবিশিষ্ট এই আদালত সাংবিধানিক জটিলতার চূড়ান্ত সমাধান করবে।
- স্থায়ী বিচার বিভাগীয় কাউন্সিল: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, হাইকোর্ট ও উপজেলা পর্যায়ে বিস্তৃতি এবং মানবাধিকার বেঞ্চ গঠনের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার সংস্কার।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারসমূহ
জেএসডি সংবিধান ও শাসন সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই টার্মে সীমাবদ্ধ রাখা, ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার, বিচারক নিয়োগ ও ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবহনে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং নিরাপদ সড়ক ও পরিবহন সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। গণমাধ্যমকে স্বাধীন, বিবিধ ও দায়িত্বশীল করতে এবং সংঘাত নিরসনে জাতীয় সমঝোতা কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ, স্বচ্ছ ও কার্যকর দুর্নীতি প্রতিরোধে পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের প্রস্তাবনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন
অর্থনৈতিক ও যুব উন্নয়নে মাইক্রো ক্রেডিট, কৃষি ও শিল্প উন্নয়ন, প্রবাসী বিনিয়োগ, উপজেলা শিল্পাঞ্চল, যুব প্রশিক্ষণ এবং ৫ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে সকল স্তরে সমঅংশীদারিত্ব, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব এবং কর্মক্ষেত্রে সমতার কথা বলা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় জীবাশ্ম জ্বালানি হ্রাস, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার, পরিকল্পিত বনায়ন ও আইনগত বাধ্যবাধকতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ভোটারদের প্রতি জেএসডি'র আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে এই ১০ দফা বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘তারা’ মার্কায় ভোট দিয়ে দলটিকে সমর্থন জানানোর জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।