দীর্ঘ বিরতির পর নিজের ‘নানি বাড়ি’ দিনাজপুরে ফিরে জনতাকে আবেগ আর যুক্তির মেলবন্ধনে ভাসালেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে দিনাজপুরের বিরামপুরে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় যোগ দিয়ে তিনি মূলত এই অঞ্চলের মানুষের সাথে পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের নতুন রসায়ন তৈরি করেন। বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে স্থানীয়দের কাছে আবদার রেখে তিনি বলেন, “দিনাজপুরের মানুষের প্রথম ফসল ধান। আর সেই ধানের শীষেই আমি আপনাদের ভোট চাইছি।”
আবেগ ও রসিকতায় ‘নাতি-নানি’ সম্পর্কের টান
জনসভার শুরুতেই তারেক রহমান স্থানীয়দের সাথে কিছুটা হালকা মেজাজে কথোপকথন শুরু করেন। তিনি হাস্যরসের ছলে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, “বহু বছর পর নানি বাড়ি এসেছি। নাতি এলো কিন্তু কিছু খাওয়ালেন না, এইটা কেমন হলো! নাতিকে কী দেবেন? ভোট দেবেন? কীসে ভোট দেবেন?” তার এই প্রশ্নে জনসমুদ্র থেকে মুহুর্মুহু ‘ধানের শীষ’ স্লোগান ভেসে আসে। এই আবেগঘন পরিবেশ মুহূর্তেই একটি সাধারণ জনসভাকে রূপ দেয় পারিবারিক মেলবন্ধনে।
কৃষি ও শিল্পায়নের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা
দিনাজপুরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তারেক রহমান কৃষিনির্ভর শিল্পায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে এ অঞ্চলের কৃষি পণ্যের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করতে ‘Agricultural Based Industry’ বা কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হবে। বিশেষ করে দিনাজপুরের বিখ্যাত লিচুর বাজার সম্প্রসারণে তাঁর ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “দিনাজপুরের লিচুকে আমরা শুধু দেশের বাজারে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়াকরণ করে এই লিচু ‘Export’ বা বিদেশে রপ্তানির স্থায়ী ব্যবস্থা করা হবে।”
নারী ও যুব উন্নয়ন: ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও প্রশিক্ষণ
সমাজের পিছিয়ে পড়া ও তৃণমূলের মানুষের জন্য বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “খালেদা জিয়া এ অঞ্চলের নারীদের শিক্ষার পথ সুগম করেছিলেন। আমরা সেই ধারা বজায় রেখে প্রতিটি পরিবারের কাছে ‘Family Card’ পৌঁছে দিতে চাই, যা বিশেষ করে মা-বোনদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে।” এছাড়া দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে ‘Skill Development’ বা কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
গণতন্ত্র রক্ষা ও জুলাই বিপ্লবের অঙ্গীকার
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তারেক রহমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “আমরা সেই বাংলাদেশ গড়তে চাই, যার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়েছেন, জুলাইয়ের বিপ্লবে আমাদের বীর যোদ্ধারা বুক পেতে দিয়েছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর আমাদের প্রধান কাজ হবে ‘National Reconstruction’ বা দেশ পুনর্গঠন করা।”
ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তারেক রহমানের মতে, জনগণের ভোটাধিকার হরণের জন্য এখনও নানা স্তরে ‘Conspiracy’ বা ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি বলেন, “খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অনেক চক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু তিনি দেশ ছেড়ে পালাননি। ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের ঢাল হতে হবে জনগণের ঐক্য।”
জনসভা শেষে তারেক রহমান দিনাজপুরের বিভিন্ন আসনের ধানের শীষের প্রার্থীদের উপস্থিত জনতার সামনে পরিচয় করিয়ে দেন এবং জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।