শীতের মৌসুমে বাংলাদেশে আবারও প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের (Nipah Virus) থাবা লক্ষ করা যাচ্ছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এক নারীর মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, ওই নারী নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই রোগটি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি (Global Risk) এখনো কম বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
নওগাঁর সেই প্রাণহানি ও সংক্রমণের উৎস ডব্লিউএইচও-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, নওগাঁ জেলার বাসিন্দা ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সি ওই নারীর শরীরে গত ২১ জানুয়ারি প্রথম জ্বর ও স্নায়বিক উপসর্গ (Neurological Symptoms) দেখা দেয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নিপাহ ভাইরাসের কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন না থাকায় এই রোগটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তদন্তে জানা গেছে, ওই নারী সম্প্রতি কোনো বিদেশ ভ্রমণ না করলেও স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কাঁচা খেজুরের রস (Raw Date Juice) পান করেছিলেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে নিপাহ সংক্রমণের প্রধান উৎস হলো বাদুড়ের লালা বা মল দ্বারা দূষিত খেজুরের রস। ৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশনস ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্ট’ (IHR NFP) বিষয়টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অবহিত করার পর সংক্রমণের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
কন্টাক্ট ট্রেসিং ও নজরদারি ব্যবস্থা সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ওই রোগীর সংস্পর্শে আসা ৩৫ জনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখে এবং তাদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা (Surveillance) সম্পন্ন করে। স্বস্তির বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত ওই ৩৫ জনের মধ্যে নতুন করে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস নিপাহকে একটি ‘বিরল কিন্তু অত্যন্ত গুরুতর রোগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখা হচ্ছে এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও নিপাহ সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তবে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, আপাতত কোনো ধরনের ভ্রমণ বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার (Trade Restriction) প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশে নিপাহর পরিসংখ্যান ও ভয়াবহ মৃত্যুহার বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসের ইতিহাস অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০০১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের ৩২টি জেলায় মোট ৩৪৩ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ২৪৫ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুর গড় হার (Fatality Rate) প্রায় ৭১ শতাংশ। সাধারণত প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত দেশে এই ভাইরাসের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। শীতকালে কাঁচা খেজুরের রস পানের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়াই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
সচেতনতাই একমাত্র প্রতিকার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। কাঁচা খেজুরের রস পান থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা এবং যেকোনো ধরনের আংশিক খাওয়া বা পাখির ঠোকরানো ফল বর্জন করা জরুরি। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা (Clinical Safety) অবলম্বন করতে হবে।
বর্তমানে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি কম থাকলেও, শীতকালীন এই মৌসুমে জনসাধারণের সতর্ক অবস্থানই পারে বড় ধরনের মহামারি রুখে দিতে।