নতুন নীতিমালার শর্তে উদ্বেগ সরকার সম্প্রতি জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা–২০২৬-এর খসড়া অনুমোদন করেছে। এই নীতিমালার ৫.৮.১.২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কেবল একদিন বয়সী গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক এবং একদিনের বাচ্চার সংকট দেখা দিলেই 'ক্ষেত্রবিশেষে' প্যারেন্ট স্টক বাচ্চা আমদানি করা যাবে। 'ক্ষেত্রবিশেষ' বলতে কী বোঝানো হয়েছে বা কোন পরিস্থিতিতে সংকট বিবেচিত হবে, তা নীতিমালায় স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতাই শিল্পের প্রধান উদ্বেগের কারণ। খামারিদের আশঙ্কা, এটি দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে পুরো খাতকে একটি সীমিত সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেবে।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্রয়লার, লেয়ার ও কালার বার্ড উৎপাদন হলেও লেয়ার ও কালার বার্ডের প্যারেন্ট স্টক প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর। ব্রয়লারের ক্ষেত্রেও নিবন্ধিত ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাস্তবে ৫ থেকে ৬টি করপোরেট মালিকানাধীন গ্রুপই প্যারেন্ট স্টক উৎপাদন করছে। এদের হাতেই প্যারেন্ট স্টক ফার্মগুলো (জিপি ফার্ম) কেন্দ্রীভূত এবং এরাই চাহিদার সিংহভাগ সরবরাহ করে। এই সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা রোগবালাই বা উৎপাদন বিঘ্নের সময় মারাত্মক সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে।
সিন্ডিকেটের সুযোগ ও মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকি বর্তমানে মাত্র ৫-৬টি প্রতিষ্ঠান প্যারেন্ট স্টক উৎপাদন করায় তারা নির্ধারিত দামে তা বিক্রি করতে চাইলে ব্রিডার ফার্মগুলোর সামনে কোনো বিকল্প থাকবে না। এতে বড় কোম্পানিগুলোর সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে, যার ফলে হ্যাচারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চাপানো দামেই প্যারেন্ট স্টক কিনতে বাধ্য হবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশে মুরগি ও ডিমের উৎপাদন হ্রাস পাবে, যার চূড়ান্ত শিকার হবেন ভোক্তা ও প্রান্তিক খামারিরা।
আমদানির প্রক্রিয়া ও সময়সাপেক্ষতা প্যারেন্ট স্টক আমদানি একটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এতে সাধারণত ৫-৬ মাস সময় লাগে। এই বাচ্চা ফার্মে তোলার পর বাজারে একদিন বয়সী বাচ্চা আসতে প্রায় ৭-৮ মাস সময় লাগে। সব মিলিয়ে সংকট সৃষ্টি হলে তা সমাধানে দেড় থেকে দুই বছর সময় লেগে যায়। তাই আমদানির পথ সংকুচিত করলে জরুরি মুহূর্তে সংকট মোকাবিলা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
খামারি ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী খামারিদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সিলেটের অয়েস্টার পোলট্রি অ্যান্ড ফিশারিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমরান হোসাইন উৎপাদন স্থিতিশীলতা, রোগবালাইয়ের আগাম প্রস্তুতি এবং বাচ্চার দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানির সুযোগ উন্মুক্ত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম ঘাটতি পূরণে উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারীদের জন্য সীমিত পরিসরে আমদানির সুযোগ রাখার কথা বলেছেন, কিন্তু তা সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান দাবি করেছেন, নীতিমালাটি সামগ্রিক পোলট্রি খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।