দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) পরিচালনার দায়িত্ব কাতারভিত্তিক বৈশ্বিক লজিস্টিক্স জায়ান্ট ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান হতে যাচ্ছে। তবে তা ইতিবাচক কোনো চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং আলোচনার টেবিল থেকেই আপাতত স্থগিত হয়ে গেল। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে এই বহুল আলোচিত ইজারা চুক্তি (Lease Agreement) সই হচ্ছে না।
আলোচনা ফলপ্রসূ, তবে প্রয়োজন আরও সময় রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আলাপকালে আশিক চৌধুরী জানান, এনসিটি ইজারা প্রসঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংলাপ চলমান ছিল। আজ কাতারভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে, যেখানে তারা আলোচনার অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে চুক্তির খুঁটিনাটি ও শর্তাবলি (Terms and Conditions) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আরও সময়ের আবেদন জানানো হয়েছে।
বিডা চেয়ারম্যান বলেন, “যেহেতু বর্তমান সরকারের হাতে আর মাত্র দুই কার্যদিবস সময় রয়েছে, তাই এই সংক্ষিপ্ত সময়ে এত বড় একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। আমরা আশা করছি, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের আমলেও এই আলোচনা চলমান থাকবে এবং পর্যায়ক্রমে একটি ফলপ্রসূ পরিণতি পাবে।”
শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে স্থবির চট্টগ্রাম বন্দর এদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রোববার সকাল ৮টা থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’। এই কর্মসূচির ফলে দেশের অর্থনীতির লাইফ-লাইন খ্যাত এই বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম (Operational Activity) পুরোপুরি থমকে গেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, জেটি, ইয়ার্ড, টার্মিনাল এমনকি প্রশাসনিক ভবনেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। বহির্নোঙরে (Outer Anchorage) জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও লাইটারেজ পরিচালনা কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খোকন হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দরের চাবি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমরা মানব না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই লড়াই চলবে।” এর আগে গত ৩১ জানুয়ারি থেকেই তারা ধারাবাহিক অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করে আসছিলেন।
অর্থনীতিতে অশনি সংকেত ও রমজানের দুশ্চিন্তা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের মোট রফতানি বাণিজ্যের প্রায় ৯১ শতাংশ সম্পন্ন হয়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়েতে দীর্ঘস্থায়ী অচলবস্থা দেশের রফতানি খাতের (Export Sector) অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে সামনে পবিত্র রমজান মাস, এই সময়ে যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য খালাস প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, তবে বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। সাপ্লাই চেইন (Supply Chain) বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় এখন বন্দর ব্যবহারকারী সাধারণ ব্যবসায়ীরাও চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তির বিষয়টি আপাতত ঝুলে গেলেও, বন্দরের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নিরসনই এখন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে এই লজিস্টিক সংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।