দেশের বর্তমান সংকট নিরসন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আমূল পরিকল্পনা নিয়ে জাতির উদ্দেশে বিশেষ ভাষণ দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টায় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (BTV) প্রচারিত এই ভাষণে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ (Zero Tolerance) ঘোষণা করেন এবং একটি ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা তুলে ধরেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা ও প্রকাশ্য শাস্তি চরমোনাই পীর তার ভাষণের শুরুতেই বাংলাদেশের প্রধান অন্তরায় হিসেবে দুর্নীতিকে চিহ্নিত করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন, “ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ক্ষমতায় গেলে এদেশ থেকে দুর্নীতিকে চিরতরে বিদায় জানানো হবে এবং দুর্নীতির হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, কেবল সাধারণ আইন নয়, বরং রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক আইনি কৌশলের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘অ্যান্টি-করাপশন ফ্রেমওয়ার্ক’ (Anti-corruption Framework) তৈরি করা হবে। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্নীতির ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ‘প্রকাশ্য শাস্তি’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধে লিপ্ত হওয়ার সাহস না পায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা চরমোনাই পীর তার বক্তব্যে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের’ (July Mass Uprising) শহীদ ও যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত কয়েক দশকের শাসনব্যবস্থা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের কর্মপদ্ধতি হিসেবে তিনি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় বোধ-বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটানোর প্রস্তাব দেন। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে তিনি ‘জাস্টিস’ (Justice) বা ইনসাফ এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
আর্থিক স্বচ্ছতা ও খাতভিত্তিক পরিকল্পনা দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুনর্গঠনে আর্থিক খাতে ব্যাপক সংস্কারের কথা বলেন মুফতি রেজাউল করীম। তিনি বলেন, “আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা (Financial Transparency) ও জবাবদিহিতা জোরদার করা হবে।” তার ভাষণে বিভিন্ন খাতের জন্য আলাদা আলাদা উন্নয়ন পরিকল্পনা বা ‘Sector-wise Planning’ তুলে ধরা হয়। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা ‘Job Creation’-কে প্রাধান্য দিয়ে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখান তিনি।
ভোটের ইসলামি গুরুত্ব ও নাগরিক দায়িত্ব আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোট প্রদানের বিষয়ে ইসলামের নীতি ও অবস্থান ব্যাখ্যা করেন চরমোনাই পীর। তিনি বলেন, ভোট কেবল একটি নাগরিক অধিকার নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আমানত। যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব নির্বাচনে ভুল করা মানে জাতির ভবিষ্যতের সাথে খিয়ানত করা। তাই তিনি ভোটারদের ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতি নৈতিকতার নিরিখে সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচনের আহ্বান জানান।
ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ইসলামী আন্দোলনের আমির তার দীর্ঘ বক্তব্যে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, তাদের রাষ্ট্রদর্শন আধুনিক ও প্রগতিশীল হলেও তা শেকড়বিচ্ছিন্ন নয়। বাঙালির ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখে একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণই তাদের লক্ষ্য। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তার এই ভাষণ প্রচারের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলো।