• ব্যবসায়
  • স্বর্ণের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা: বছর শেষ না হতেই ২৭ বার দাম সমন্বয়ের নেপথ্যে আসল কারণ কী?

স্বর্ণের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা: বছর শেষ না হতেই ২৭ বার দাম সমন্বয়ের নেপথ্যে আসল কারণ কী?

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
স্বর্ণের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা: বছর শেষ না হতেই ২৭ বার দাম সমন্বয়ের নেপথ্যে আসল কারণ কী?

বিশ্ববাজারের টালমাটাল পরিস্থিতি ও পাচার রোধে কড়াকড়ি; বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় বাজুসের নতুন কৌশল এবং দেশের বর্তমান বাজারচিত্র নিয়ে বিশ্লেষণ।

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম এখন যেন এক অস্থির ‘রোলার কোস্টার’ রাইড। বছরের শুরু থেকেই মূল্যবান এই ধাতুর দামে কখনো আকাশচুম্বী উল্লম্ফন, আবার কখনো বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে। সাধারণ ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—কেন এত ঘন ঘন পরিবর্তন করা হচ্ছে স্বর্ণের দাম? পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েক মাসে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭ বার বাড়ানো হয়েছে এবং ১০ বার কমানো হয়েছে।

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও ‘পেপার ট্রেডিং’ রহস্য

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এর তথ্যমতে, দেশের বাজারে স্বর্ণের এই ঘন ঘন পরিবর্তনের মূল সূত্রটি লুকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক বাজারে (Global Market)। বিশ্ববাজারে প্রতি মুহূর্তের দর ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলে স্থানীয় জুয়েলারি ইন্ডাস্ট্রিতে। বাজুসের সভাপতি এনামুল হক খান এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন।

তিনি জানান, বর্তমান বিশ্বের স্বর্ণের বাজার কেবল ‘ফিজিক্যাল গোল্ড’ বা বাস্তব মজুত স্বর্ণের ওপর নির্ভর করছে না। বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বর্ণের লেনদেনের বড় একটি অংশ হচ্ছে ‘পেপার ট্রেডিং’ (Paper Trading) বা কাগজে-কলমে কেনাবেচার মাধ্যমে। অনেক সময় বাজারে বাস্তবে স্বর্ণের যোগান না থাকলেও ডিজিটাল স্টক বা বন্ডের মাধ্যমে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করা হয়, যা দামের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বাজুস সভাপতি স্পষ্ট করেছেন যে, এই অস্থিরতার পেছনে বাংলাদেশের কোনো স্থানীয় কারণ নেই; বরং বিদেশের বাজারে হওয়া এই ‘স্পেকুলেশন’ বা জল্পনা-কল্পনার মাশুল দিতে হচ্ছে এদেশীয় ক্রেতাদের।

পাচার রোধে সতর্কতামূলক কৌশল

দেশের বাজারে ঘন ঘন দাম সমন্বয়ের পেছনে অন্যতম শক্তিশালী একটি কারণ হলো ‘গোল্ড স্মাগলিং’ বা স্বর্ণ পাচার রোধ করা। বাজুস নেতৃত্বের দাবি, যদি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারের দামের ব্যবধান অনেক বেশি হয়, তবে দেশের স্বর্ণ বাইরে পাচার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। যখন বিশ্ববাজারে দাম বাড়ে কিন্তু স্থানীয় বাজারে সেই অনুপাতে সমন্বয় করা হয় না, তখন এক শ্রেণির অসাধু চক্র দেশ থেকে স্বর্ণ দেশের বাইরে নিয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য ক্ষতি রোধ করতে এবং দেশের সম্পদ পাচার হওয়া আটকাতে বাজুস দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

নিরাপদ বিনিয়োগ বা ‘সেফ ইনভেস্টমেন্ট’ হিসেবে স্বর্ণ

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ শেয়ার বাজার বা অন্যান্য খাতের চেয়ে স্বর্ণকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ (Safe Investment) হিসেবে দেখছে। যখন মুদ্রাস্ফীতি বা রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন বড় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ মজুত করতে শুরু করেন, যাকে অর্থনৈতিক ভাষায় ‘হেজিং’ বলা হয়। বাজুস সভাপতির মতে, এই উচ্চ চাহিদাও দামের অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে। তবে বাজারে আসলে কতটা ‘ফিজিক্যাল গোল্ড’ রয়েছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়েই এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি ও সর্বশেষ দর

সবশেষ গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে বাজুস এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বর্ণের দাম বড় অংকে কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবার ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমানো হয়েছে। নতুন এই সমন্বয়ের পর দেশের বাজারে স্বর্ণের বর্তমান চিত্রটি নিম্নরূপ:

২২ ক্যারেট (প্রতি ভরি): ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা।

২১ ক্যারেট (প্রতি ভরি): ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা।

১৮ ক্যারেট (প্রতি ভরি): ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা।

সনাতন পদ্ধতি (প্রতি ভরি): ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতি ও ডলারের মান স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত স্বর্ণের বাজারে এই ‘আপ অ্যান্ড ডাউন’ বা উত্থান-পতন অব্যাহত থাকতে পারে। জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, দামের এই ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে সাধারণ অলঙ্কার ক্রেতারা কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি এখনও লাভজনক একটি খাত।

Tags: bangladesh economy gold price global market bajus news market volatility price adjustment inflation news gold smuggling paper trading safe investment