বর্তমান বিশ্বের অশান্ত ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এবং ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক সংঘাতের আবহে দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে শুরু করেছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-চালিত সমরাস্ত্র এবং বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেটের (Defense Budget) ওপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর তালিকা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার’ (Global Firepower)। ৬০টিরও বেশি সূচক বা প্যারামিটারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ইনডেক্সে এবার বেশ কিছু নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
শীর্ষ তিনের লড়াই: অপরাজেয় আমেরিকা, ধেয়ে আসছে চীন-রাশিয়া ‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স ২০২৬’ অনুযায়ী, টানা ২১ বছর ধরে বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA)। ০.০৭৪১ স্কোর নিয়ে তারা তালিকার শীর্ষে। মূলত তাদের বিশাল বিমানবাহিনী, নৌ-শক্তির আধিপত্য এবং গ্লোবাল লজিস্টিক নেটওয়ার্ক তাদের এই শীর্ষস্থানে অটুট রেখেছে।
তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে রাশিয়া (০.০৭৯১) ও চীন (০.০৯১৯)। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সামরিক উৎপাদন বৃদ্ধি এবং চীনের নৌ-শক্তির আধুনিকায়ন ও স্টিলথ টেকনোলজি (Stealth Technology)-তে বিনিয়োগ তাদের এই অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে। উল্লেখ্য, এই সূচকে স্কোর ০.০০০-এর যত কাছাকাছি হয়, সেই দেশের সামরিক সক্ষমতা তত শক্তিশালী বলে বিবেচিত হয়।
এশিয়ায় ভারতের জয়জয়কার ও দক্ষিণ কোরিয়ার দাপট বিশ্বের সামরিক শক্তির শীর্ষ পাঁচে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের একাধিপত্য বজায় রেখে ভারত চতুর্থ শক্তিশালী দেশ হিসেবে জায়গা ধরে রেখেছে। পরমাণু শক্তিধর এই দেশটির বিশাল জনবল এবং ক্রমবর্ধমান দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন (Indigenization) তাদের এই কৃতিত্বের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। তালিকার পঞ্চম স্থানে রয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক শক্তির দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মাঝে তারা তাদের উচ্চপ্রযুক্তির সমরাস্ত্র ও মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ইউরোপীয় শক্তির উত্থান-পতন: ফ্রান্স ও জার্মানির চমক, পিছিয়ে পড়ছে ব্রিটেন ২০২৬ সালের এই ইনডেক্সে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক উন্নতি করে ফ্রান্স সপ্তম থেকে উঠে এসেছে ষষ্ঠ স্থানে। অন্যদিকে, রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা বাজেট কয়েক গুণ বাড়িয়ে জার্মানি বড় লাফ দিয়েছে। ২০২৪ সালে ১৯তম স্থানে থাকা দেশটি ২০২৬ সালে উঠে এসেছে ১২তম অবস্থানে।
বিপরীত চিত্র দেখা গেছে যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে। এক সময় ষষ্ঠ স্থানে থাকা দেশটি ক্রমাগত পিছিয়ে ২০২৬ সালে অষ্টম স্থানে নেমে গেছে। প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট সীমাবদ্ধতা এবং নৌ-বাহিনীর আধুনিকায়নের ধীরগতি এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া ইতালি ০.২২১১ স্কোর নিয়ে শীর্ষ দশে (Top 10) নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট: পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান গত বছরের ১২তম স্থান থেকে পিছিয়ে ২০২৬ সালে ১৪তম অবস্থানে নেমে গেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। ইসরায়েল ১৫তম স্থানে থাকলেও তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরান ১৬তম স্থানে অবস্থান করছে। ড্রোন প্রযুক্তি এবং মিসাইল প্রোগ্রামে ইরানের সাফল্য তাদের এই বৈশ্বিক তালিকায় শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া ১৭তম, স্পেন ১৮তম এবং মিশর ১৯তম স্থানে রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে লিপ্ত ইউক্রেন সামরিক সাহায্যের ওপর ভর করে ২০তম স্থানে অবস্থান করছে।
৩৭ নম্বরে বাংলাদেশ: দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে সক্ষমতা ২০২৬ সালের বৈশ্বিক সামরিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৭তম। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তার ডিফেন্স ফোর্সেস গোল ২০৩০ (Forces Goal 2030) এর অধীনে আধুনিক যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন এবং স্মার্ট সমরাস্ত্র সংগ্রহ করে নিজের সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। ইনডেক্স অনুযায়ী, কৌশলগত অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল সামরিক শক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত করছে।
যেভাবে নির্ধারণ করা হয় এই তালিকা গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার মূলত একটি দেশের সামরিক সরঞ্জামের সংখ্যা, সক্রিয় সৈন্য সংখ্যা, আর্থিক সচ্ছলতা (Financial Stability), লজিস্টিক সক্ষমতা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের মতো ৬০টিরও বেশি ফ্যাক্টর বিশ্লেষণ করে। এখানে শুধুমাত্র পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেই শীর্ষে থাকা যায় না, বরং একটি দেশ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে কতক্ষণ টিকে থাকতে পারবে, সেই সহনশীলতাই (Endurance) এই র্যাঙ্কিংয়ের মূল চাবিকাঠি।