বিশ্ব ফুটবলের ধ্রুপদী মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড—এই দুটি নাম যেন একে অপরের পরিপূরক। তবে ২০২২ সালের নভেম্বরে ওল্ড ট্র্যাফোর্ড থেকে তার বিদায়টা মোটেও সুখকর ছিল না। সম্প্রতি সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল নাসরে রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতেই আবারও গুঞ্জন শুরু হয়েছে, তবে কি আরও একবার ‘থিয়েটার অব ড্রিমস’-এ ফিরছেন এই পর্তুগিজ গোলমেশিন? ৪১ বছর বয়সেও কি ‘রেড ডেভিলস’দের জার্সিতে তৃতীয় দফায় দেখা যাবে তাকে? এই চমকপ্রদ সম্ভাবনা নিয়ে ক্লাব কর্তৃপক্ষ ও ফুটবল বিশেষজ্ঞদের অবস্থান এখন স্পষ্ট।
আল নাসরে অসন্তোষ ও ‘ধর্মঘট’ বিতর্ক সৌদি প্রো লিগে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম লাভজনক চুক্তিতে (Lucrative Contract) রয়েছেন রোনালদো। কিন্তু সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে তিনি ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) নিয়ন্ত্রিত ক্লাবগুলোর মধ্যে অর্থ বণ্টন এবং ক্লাব পরিচালনার অভ্যন্তরীণ নীতিমালা নিয়ে সিআরসেভেনের অসন্তুষ্টি এখন প্রকাশ্য। টানা দুটি ম্যাচে তাকে ছাড়াই আল নাসরের জয় এবং তার ‘ধর্মঘটে’ যাওয়ার খবর ফুটবল বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে মাঠের ভেতরে ও বাইরে অতিরিক্ত আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে, যা লিগ কর্তৃপক্ষ ভালোভাবে নিচ্ছে না।
রিলিজ ক্লজ ও ২০২৬-এর লক্ষ্য রোনালদোর চুক্তিতে ৪৪ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার)-এর একটি রিলিজ ক্লজ (Release Clause) রয়েছে, যা আগামী ট্রান্সফার উইন্ডোতেই সক্রিয় করা সম্ভব। স্কাই স্পোর্টসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোনালদো কর্তৃপক্ষকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যদি পর্যাপ্ত ‘স্পোর্টস গ্যারান্টি’ বা ক্রীড়াগত নিশ্চয়তা না পান, তবে তিনি ক্লাব ছাড়তে দ্বিধা করবেন না। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নিজেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফিট রাখাই এখন তার মূল লক্ষ্য।
ইউনাইটেড কি সত্যিই আগ্রহী? রোনালদোকে ঘিরে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের আবেগী ভক্তরা স্বপ্ন দেখলেও, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষের অবস্থান একেবারেই বিপরীত। ক্লাবের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে স্কাই স্পোর্টস জানিয়েছে, রোনালদোকে তৃতীয় দফায় ফিরিয়ে আনার কোনো পরিকল্পনা রেড ডেভিলসদের নেই। মূলত ক্লাবটি এখন দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে মনোযোগী, যেখানে ৪১ বছর বয়সী একজন ফুটবলার কেবল স্বল্পমেয়াদী সমাধান হতে পারেন। এছাড়া ২০২২ সালে তার নাটকীয় বিদায়ের পর সেই ‘ক্লোজড চ্যাপ্টার’ বা বন্ধ অধ্যায় নতুন করে খোলার কোনো ইচ্ছা ম্যানেজমেন্টের নেই।
বিকল্প গন্তব্য: স্পোর্টিং লিসবন নাকি ইন্টার মায়ামি? ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফেরার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রোনালদোর সামনে এখন দুটি বড় পথ খোলা রয়েছে। একটি হলো তার শৈশবের ক্লাব স্পোর্টিং লিসবনে ফিরে গিয়ে ক্যারিয়ারের ইতি টানা। অন্যটি হলো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসির সঙ্গে এমএলএস (MLS) লিগের ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জুটির জন্ম দেওয়া। আমেরিকান লিগের বাণিজ্যিক মূল্য (Market Value) এবং প্রচারণার কথা মাথায় রেখে এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
প্রাক্তন সতীর্থের বিশ্লেষণ ইউনাইটেডের সাবেক ডিফেন্ডার ওয়েস ব্রাউন এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “রোনালদো বর্তমানে খুশি নন, এটা স্পষ্ট। তবে সে কি আবারও ইউনাইটেডে ফিরবে? আমার মনে হয় না। এই ফেরার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি আমি খুঁজে পাচ্ছি না। হয়তো সে পর্তুগালে ফিরবে অথবা আমেরিকায় পাড়ি জমাবে। সবচেয়ে বড় কথা, সে বিশ্বকাপ খেলতে চায় এবং সেটার জন্য নিয়মিত খেলা প্রয়োজন।”
রোনালদোর পরবর্তী পদক্ষেপ যাই হোক না কেন, ফুটবল ইতিহাসের এই ‘গোট’ (GOAT) যে ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে এসেও বিশ্ব ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, তা বলাই বাহুল্য। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে তার প্রতিটি পদক্ষেপই এখন ফুটবল বিশ্বের জন্য একেকটি বড় সংবাদ।