আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তীব্র ভাবমূর্তি সংকটের মুখে পড়েছে পাকিস্তান। দেশটিতে শিকড় গেড়ে বসা ‘ভিক্ষা মাফিয়া’ বা সংগঠিত ভিক্ষাবৃত্তির সিন্ডিকেটের কারণে মধ্যপ্রাচ্য তথা উপসাগরীয় দেশগুলো পাকিস্তানিদের জন্য ভিসা বিধিনিষেধ (Visa Restrictions) আরোপ করতে শুরু করেছে। সোমবার (৯ জানুয়ারি) পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সংগঠিত অপরাধ যখন পেশা: করাচির সেই ভাইরাল ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) বিখ্যাত সমাজকর্মী জাফর আব্বাসের শেয়ার করা একটি ভিডিও পাকিস্তানজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। করাচির শাহ ফয়সাল এলাকার এক শিশুর সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে ভিক্ষাবৃত্তির পেশাদার ও লাভজনক রূপ। শিশুটি জানায়, সে এবং তার দুই ভাই মিলে সপ্তাহে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার রুপি আয় করে, যা দিয়ে তারা সম্প্রতি একটি বাড়িও কিনেছে।
এই ভিডিওটির সূত্র ধরে খাজা আসিফ মন্তব্য করেন, পাকিস্তানে ভিক্ষাবৃত্তি এখন আর নিছক অসহায়ত্ব নয়, বরং একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত ‘মাফিয়া নেটওয়ার্ক’ (Mafia Network)। প্রভাবশালী ঠিকাদাররা এই চক্র পরিচালনা করছে এবং নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করছে।
উপসাগরীয় দেশে ‘ভিক্ষুক রপ্তানি’ ও ভিসা সংকট প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেট কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা হাজার হাজার ভিক্ষুককে পরিকল্পিতভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে (Gulf Countries) পাঠাচ্ছে। এর ফলে ওই দেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামাজিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ (UAE) একাধিক রাষ্ট্র পাকিস্তানিদের ভিসা প্রদান সীমিত করার অথবা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছে। আসিফ জানান, বিষয়টি কেবল লজ্জাজনকই নয়, এটি পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্নীতি ও প্রশাসনিক যোগসাজশের অভিযোগ এই ‘লজ্জাজনক ব্যবসায়’ খোদ সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন খাজা আসিফ। তিনি সাফ জানান, বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা এই অবৈধ পাচার ও সিন্ডিকেটের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা ভোগ করছেন। প্রশাসনের শক্তিশালী ‘প্যাট্রোনেজ’ বা পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনো শহরেই এমন বিশাল নেটওয়ার্ক কাজ করা অসম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও শিয়ালকোটের অভিজ্ঞতা শিয়ালকোটের উদাহরণ টেনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, মূলত দক্ষিণ পাঞ্জাব থেকে আসা ভিক্ষুকরা বড় বড় শহরের হোটেলে অবস্থান করে এই ব্যবসা পরিচালনা করে। পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযানে এই তৎপরতা কিছুটা কমলেও প্রভাবশালী ঠিকাদাররা গ্রেফতারকৃতদের ছাড়িয়ে নিতে সুপারিশ নিয়ে হাজির হন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভিক্ষাবৃত্তির আড়ালে মাদক ও মানবপাচারের মতো আরও ভয়াবহ অপরাধের যোগসূত্র রয়েছে।
এই সামাজিক ও আইনগত সংকট কাটাতে না পারলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার পাকিস্তানের হাতছাড়া হওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি প্রবাসীদের মর্যাদা রক্ষা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে দেশের ‘গ্লোবাল ইমেজ’ (Global Image) পুনরুদ্ধারে এখনই কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।