বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি (ICC), পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (PCB) ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (BCB) শীর্ষ পর্যায়ের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে নতুন সমীকরণ উঁকি দিচ্ছে। লাহোরের ঐতিহাসিক গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী এই হাই-ভোল্টেজ মিটিংয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও, পর্দার আড়ালে বড় ধরনের সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতিতে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইসিসি একটি মধ্যপন্থা অবলম্বনের চেষ্টা করছে।
ক্ষতিপূরণ নয়, আয়ের পূর্ণ অংশ পাচ্ছে বিসিবি পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ‘ডন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত সফরে বাংলাদেশের অসম্মতি এবং পরবর্তীতে বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তির ফলে বিসিবির যে আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে আইসিসি ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। যদিও আইসিসি সরাসরি ‘ক্ষতিপূরণ’ (Compensation) দিতে রাজি নয়, তবে তারা বিসিবিকে আশ্বস্ত করেছে যে আইসিসির মোট বার্ষিক আয় থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্য পূর্ণ অংশ (Full Revenue Share) বুঝিয়ে দেওয়া হবে। ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থাটি মনে করছে, সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, তবে বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া হবে না।
ভারত-পাক ম্যাচ বর্জন ও ‘ফোর্স মাজর’ বিতর্ক এদিকে, বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পক্ষ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারির ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ বয়কটের (Boycott) ঘোষণা ক্রিকেট বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আইসিসি পিসিবিকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এই ম্যাচটি না হলে সংস্থাটি অপূরণীয় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজা পরামর্শ দিয়েছেন, পিসিবি যেন অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে এবং বিষয়টি আইসিসির আরবিট্রেশন কমিটি (Arbitration Committee) বা বোর্ড মিটিংয়ে উত্থাপন করে।
আইসিসি পিসিবির কাছে জানতে চেয়েছে, মেম্বারস পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট (MPA) অনুযায়ী ‘ফোর্স মাজর’ (Force Majeure) বা নিয়ন্ত্রণাতীত পরিস্থিতির স্বপক্ষে তাদের কাছে কী প্রমাণ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি নির্দেশনার কারণে ম্যাচ খেলতে না পারার বিষয়টি নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। পিসিবি যদি এতে ব্যর্থ হয়, তবে আইসিসি তাদের সদস্যপদ স্থগিত (Suspension) বা বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও মোস্তাফিজ ইস্যু পুরো সংকটের মূলে রয়েছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা শঙ্কা। আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বিসিসিআই-এর নির্দেশে সরিয়ে দেওয়ার পর বিসিবি ভারতে তাদের সব ম্যাচ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আয়োজনের দাবি জানায়। কিন্তু আইসিসি সেই অনুরোধে সায় না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। পাকিস্তান সরকার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ভারতের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে।
পিসিবির আইনি অবস্থান ও অতীত নজির পিসিবি অবশ্য আইনি লড়াইয়ের জন্য কোমর বেঁধে নামছে। তাদের বিশ্বাস, ২০১৪ সালের দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনে বিসিসিআই-এর ব্যর্থতার যে নজির রয়েছে, সেটিই তাদের বর্তমান অবস্থানের বড় হাতিয়ার। তৎকালীন সময়ে ভারত সরকার বিসিসিআই-কে পাকিস্তানের সাথে খেলার অনুমতি না দেওয়ায় সিরিজটি বাতিল হয়েছিল। পিসিবি মনে করছে, এবারও যদি পাকিস্তান সরকার তাদের ভারত ম্যাচ খেলতে বাধা দেয়, তবে আইসিসি কোনোভাবেই তাদের অভিযুক্ত করতে পারবে না।
আইসিসি ও দুই বোর্ডের মধ্যকার এই টানাপড়েন কেবল মাঠের ক্রিকেট নয়, বরং এশিয়ার ক্রিকেটের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ডিজিটাল ডিসকোর্সে (Digital Discourse) এক নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচের আগে এই জট শেষ পর্যন্ত কীভাবে খোলে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সারা বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীরা।