ইউক্রেনের আকাশজুড়ে আবারও ঘনীভূত হয়েছে যুদ্ধের বিভীষিকা। রাশিয়ার রাতভর চালানো ড্রোন হামলায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বোহোদুখিভ শহরে একটি সাধারণ বেসামরিক বাসভবনে রুশ ড্রোনের সরাসরি আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের চারজন—বাবা ও তার তিন অবোধ শিশু। এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে একমাত্র জীবিত উদ্ধার হওয়া ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা মা বর্তমানে লড়ছেন মৃত্যুর সাথে।
একটি সাজানো সংসারের করুণ সমাপ্তি
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে যখন বোহোদুখিভ শহরের বাসিন্দারা ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই রাশিয়ান ‘কামিকাজে’ ড্রোনটি আঘাত হানে একটি আবাসিক বাড়িতে। মুহূর্তের মধ্যেই দোতলা বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। খারকিভ আঞ্চলিক প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্যমতে, উদ্ধারকারীরা কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বাবা, দুই বছর বয়সী যমজ দুই ছেলে এবং তাদের মাত্র এক বছর বয়সী ছোট বোনের নিথর দেহ উদ্ধার করেন।
পরিবারটির একমাত্র বেঁচে যাওয়া সদস্য শিশুদের মা বর্তমানে স্থানীয় হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গুরুতর দগ্ধ হওয়া ছাড়াও বিস্ফোরণের অভিঘাতে তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গর্ভস্থ সন্তানের জীবন রক্ষা করা এখন চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বোহোদুখিভ শহরে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক
এই মর্মান্তিক ঘটনায় বোহোদুখিভ শহরের মেয়র ভলোদিমির বিয়েলিই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছেন। শোকাতুর মেয়র বলেন, “আমরা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—আমাদের ভবিষ্যৎ—হারিয়েছি। এই শোক প্রকাশের ভাষা নেই। যে মা তার সন্তানদের হারিয়েছেন, তার হৃদয়ের ক্ষত কোনো প্রার্থনাই নিরাময় করতে পারবে না।” রুশ সীমান্ত থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহরটি যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়ার অন্যতম টার্গেট (Target) হিসেবে পরিচিত।
সুমিতেও দুই শিশুর মৃত্যু; ১২৯ ড্রোনের আক্রমণ
খারকিভের পাশাপাশি সুমি অঞ্চলেও রাশিয়ার নৃশংস হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সুমিতে পৃথক ড্রোন হামলায় আরও দুই শিশু নিহত হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাত থেকে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ইউক্রেনজুড়ে মোট ১২৯টি দূরপাল্লার ড্রোন (Long-range Drone) নিক্ষেপ করেছে।
এই ড্রোনগুলোর লক্ষ্যবস্তু ছিল কোনো সামরিক স্থাপনা নয়, বরং জনবহুল বেসামরিক এলাকা। জাপোরিঝঝিয়ার একটি হাসপাতাল, সুমি অঞ্চলের কোনোতোপে একটি রেল ডিপো এবং দিনিপ্রো ও পোলতাভায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে। ইউক্রেনের উপপ্রধানমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা জানান, দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের একটি রেলস্টেশনে হামলার ফলে রেল লজিস্টিক (Logistics) এবং অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়া কি শান্তির পথে? জেলেনস্কির হুঁশিয়ারি
চলমান এই সহিংসতা রাশিয়ার শান্তি আলোচনার প্রস্তুতির দাবির ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কূটনৈতিক তৎপরতা (Diplomatic Efforts) চললেও রাশিয়ার প্রতিটি হামলাই প্রমাণ করে তারা যুদ্ধ থামাতে নয়, বরং ধ্বংসযজ্ঞ দীর্ঘায়িত করতে চায়। আমাদের ওপর চাপানো এই হত্যাযজ্ঞ থামাতে হলে রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োজন।”
পাল্টা আঘাত ইউক্রেনের: রাশিয়ার ভেতরেও ড্রোন হামলা
ইউক্রেনও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, তাদের বিমান ও আর্টিলারি (Artillery) বাহিনী রাশিয়ার অভ্যন্তরে একটি ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, পাঁচটি কমান্ড পোস্ট (Command Post) এবং ছয়টি আর্টিলারি সিস্টেমে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা রাতভর ১০৮টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে রুশ শহর ভলগোগ্রাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকারখানায় (Industrial Plant) ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের এই নতুন মাত্রা আন্তর্জাতিক মহলকে আবারও ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে শিশুদের প্রাণহানি ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচার হামলা যুদ্ধের মানবিকতাকে এক চরম সঙ্কটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।